
নিউজ ডেস্ক, ২০ ফেব্রুয়ারি: ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠকে চার মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। বৈঠকে আদানির সঙ্গে করা চুক্তিসহ বিগত সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তির বিষয়েও আলোচনা হয় ।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় রিভিউ কমিটি (এনআরসি) ইতোমধ্যে আদানি পাওয়ার লিমিটেডের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনা করে সেটিকে দেশের জন্য অস্বচ্ছ ও অসম বলে উল্লেখ করেছে। কমিটি চুক্তির শর্ত পুনর্বিবেচনা অথবা বাতিলের সুপারিশ করেছে ।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম যখন ৪ দশমিক ৪৬ সেন্ট ছিল, তখন আদানির সঙ্গে ৮ দশমিক ৬১ সেন্টে চুক্তি করা হয়। দাম নির্ধারণে এক অদ্ভুত সূচক দেওয়া আছে চুক্তিতে, যার ফলে আদানিকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দাম দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এতে প্রতিবছর আদানি বাড়তি নিচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫-৬ হাজার কোটি টাকার সমতুল্য। ২৫ বছর চুক্তির মেয়াদে এক হাজার কোটি ডলার বাড়তি নিয়ে যাবে তারা ।
বৈঠকে ওই সুপারিশগুলো নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, "বিগত সরকারের সময়ে করা কিছু চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেগুলো পর্যালোচনা শুরু করেছে। জনস্বার্থ, আর্থিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বিধিবিধান বিবেচনায় রেখেই আদানির সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"
শপথ গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে রমজান, সেচ ও গ্রীষ্মকাল সামনে রেখে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক অবস্থা নিয়ে দ্রুত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় বিপিডিবির সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে আদানির সঙ্গে প্রকল্পের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ২৫ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সই হয়। ২০২৩ সালের এপ্রিলে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে ।
জাতীয় রিভিউ কমিটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো কারণে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতি হলে চুক্তি অনুযায়ী তার দায় নিতে হবে বাংলাদেশকে। আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত মান অনুযায়ী সাধারণত স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ দেশের কর্পোরেট কর নিজেরাই বহন করে। কিন্তু আদানি চুক্তিতে এ প্রচলন থেকে ব্যতিক্রম ঘটিয়ে ভারতের কর্পোরেট করের উপাদান বাংলাদেশে চার্জ করা হয়েছে ।
পর্যালোচনা কমিটির সদস্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বৈঠকে অংশ নিয়ে বলেন, "যেসব তথ্য আছে, তা দিয়ে আদানির চুক্তি বাতিল করে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার এটা করতে পারে।"
এদিকে, আদানি পাওয়ার জানিয়েছে, পর্যালোচনা কমিটি তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেনি বা প্রতিবেদনের কপি দেয়নি। তাই তারা এ নিয়ে মন্তব্য করতে পারবে না। কোম্পানিটি বলছে, বড় অঙ্কের বকেয়া থাকা সত্ত্বেও তারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে, যেখানে অন্যান্য উৎপাদকরা সরবরাহ কমিয়েছে বা বন্ধ করে দিয়েছে ।
বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় কমিটির সদস্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খানও এতে অংশ নেন। বৈঠক শেষে জানানো হয়, জাতীয় কমিটির সুপারিশ সরকার গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে এবং এ বিষয়ে আরও আলোচনা চলবে।