
নির্বাচন কমিশনের তথ্যে ৫০ দল, ১১৯ প্রতীক ও ২০২৮ প্রার্থীর লড়াই; সংস্কার প্রশ্নে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট ঐতিহাসিক সংযোজন
ঢাকা, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে অভূতপূর্ব এক মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী প্রতীকের সংখ্যার দিক থেকে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ নিয়ে আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটে নামছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫০টি দল এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় তারা অনুপস্থিত। এছাড়া আরও আটটি নিবন্ধিত দল কোনো প্রার্থী দেয়নি। সব মিলিয়ে মোট প্রার্থী দাঁড়িয়েছে ২০২৮ জন, যারা লড়ছেন ১১৯টি নির্বাচনী প্রতীকে।
২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে যেখানে ২৮টি দল ও ৬৯টি প্রতীক ছিল, সেখানে এবার প্রায় দ্বিগুণ দল ও প্রতীকের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করল।
সংস্কার ভোট ‘হ্যাঁ-না’ ব্যবস্থা
এবারের নির্বাচনে সংযোজিত হয়েছে অভিনব মাত্রা। সংস্কার প্রস্তাবের ওপর ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন প্রস্তাব সংবলিত এ ব্যবস্থাকে ইসি ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
যে ৮ দলের কেউ নেই মাঠে
নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা আওয়ামী লীগ ছাড়াও আরও ৮টি নিবন্ধিত দল কোনো প্রার্থী দেয়নি। দলগুলো হলো—
সাম্যবাদী দল (এম.এল)
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ
বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি
বিকল্পধারা বাংলাদেশ (বিডিবি)
তৃণমূল বিএনপি
বাংলাদেশ জাতীয়বাদী আন্দোলন (বিএনএম)
তরিকত ফেডারেশন
দল ও প্রতীকভিত্তিক প্রার্থী বিন্যাস
এবারের নির্বাচনে সর্বোচ্চ প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন ২৮৮ জন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, হাতপাখা প্রতীকে ২৫৩ জন প্রার্থী দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ২২৪ জন এবং জাতীয় পার্টি (জাপা) লাঙল প্রতীকে ১৯২ জন প্রার্থী দিয়েছে।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দল ও তাদের প্রার্থী সংখ্যা:
গণ অধিকার পরিষদ (ট্রাক): ৯০ জন
সিপিবি (কাস্তে): ৬৫ জন
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মই): ৩৯ জন
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (রিকশা): ৩৪ জন
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি (শাপলা কলি): ৩২ জন
খেলাফত মজলিস (দেওয়াল ঘড়ি): ২১ জন
আমার বাংলাদেশ-এবি পার্টি (ঈগল): ৩০ জন
গণফোরাম (উদীয়মান সূর্য): ১৯ জন
গণসংহতি আন্দোলন (মাথাল): ১৭ জন
এলডিপি (ছাতা): ১২ জন
নাগরিক ঐক্য (কেটলি): ১১ জন
বর্জনের মাঝে জাসদের প্রার্থী নিয়ে দ্বন্দ্ব
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) ছয়জন প্রার্থী ইসির চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন। জাসদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, দল নির্বাচন বর্জন করলেও কিছু প্রার্থী হয়তো ব্যক্তিগতভাবে অংশ নিচ্ছেন। তবে বিষয়টি নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস: এক নজরে
১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪টি দল অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়ের পর থেকে বারবার পাল্টেছে নির্বাচনের ধরন, দলের সংখ্যা ও প্রতীক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের সফল নির্বাচন, এরশাদ আমলে বিএনপির বর্জন, ২০১৪ সালের বিতর্কিত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ বিতর্ক, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন— সব পেরিয়ে এবার অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ভারতপালানের পর রাষ্ট্রপতি সংসদ বিলু্ত ঘোষণা করেন। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের অধীনে প্রথম এই নির্বাচন আয়োজন ঘিরে দেশজুড়ে উৎসুক্য ও আগ্রহ দেখা দিয়েছে।