
আন্তর্জাতিক ডেস্ক – বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম 'এপস্টাইন ফাইল'। মার্কিন ফিনান্সিয়ার জেফ্রি এপস্টাইন এবং তার সহযোগী গিলেইন ম্যাক্সওয়েলের দীর্ঘ তদন্তের পর আদালতের নির্দেশে প্রকাশিত হাজার হাজার পৃষ্ঠার এই নথি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এই ফাইলগুলো কেবল কিছু নাম নয়, বরং এটি একটি আন্তর্জাতিক শিশু পাচার ও যৌন শোষণ চক্রের দালিলিক প্রমাণ বলে দাবি করা হচ্ছে।
ফাইলগুলোতে পাওয়া গেছে এপস্টাইনের ব্যক্তিগত দ্বীপ 'লিটল সেন্ট জেমস'-এর রোমহর্ষক বর্ণনা, যা 'পাপের দ্বীপ' হিসেবে পরিচিত। এছাড়া এপস্টাইনের ব্যক্তিগত বিমান 'ললিটা এক্সপ্রেস'-এর ফ্লাইট লগ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে দেখা গেছে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কীভাবে নিয়মিত সেই দ্বীপে যাতায়াত করতেন। ভুক্তভোগী নারীদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে অবর্ণনীয় নির্যাতনের চিত্র।
এই নথিতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, প্রিন্স অ্যান্ড্রু, প্রযুক্তি খাতের বিল গেটস থেকে শুরু করে হলিউডের নামিদামি তারকাদের নামের উল্লেখ রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম নিয়ে। ২০১১ সালের একটি ইমেইলে দেখা যায়, এপস্টাইন তার সহযোগীকে লিখেছেন যে একজন ভুক্তভোগী ট্রাম্পের বাড়িতে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন।
তবে হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, ওই ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া গিফ্রে নিজেই মৃত্যুর আগে জানিয়েছিলেন যে তিনি ট্রাম্পকে কোনো অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হতে দেখেননি। ট্রাম্পও দাবি করেছেন, ২০০৮ সালে এপস্টাইন প্রথমবার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই তিনি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন।
প্রকাশিত নথির একাংশে বাংলাদেশের একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। তবে বাংলাদেশি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এপস্টাইনের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
নথিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামের পাশাপাশি ব্র্যাক, আইসিডিডিআর,বি এবং ওয়েস্ট কনসার্ন বাংলাদেশের উল্লেখ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এপস্টাইনের যোগাযোগ ছিল মূলত বিনিয়োগ, গবেষণা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের প্রসঙ্গে।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো এপস্টাইনের ব্ল্যাকমেইল ষড়যন্ত্রের অভিযোগ। ধারণা করা হয়, এপস্টাইন তার দ্বীপে আসা ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের যৌন কর্মকাণ্ড গোপন ক্যামেরায় রেকর্ড করে রাখতেন। পরবর্তীতে এই ভিডিওগুলো দিয়ে তিনি বিশ্বনেতাদের ব্ল্যাকমেইল করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জেফ্রি এপস্টাইন ২০১৯ সালে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের দিয়ে যৌন ব্যবসার নেটওয়ার্ক চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। তবে বিচারের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় কারাগারে তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়, যা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এপস্টাইন সংক্রান্ত কোনো নথি বা তথ্য চেয়ে আমেরিকা বা আন্তর্জাতিক আদালতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা হয়নি। প্রকাশিত নথিতে বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এপস্টাইনের অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ নেই বলেও নিশ্চিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. আশরাফুজ্জামান বলেন, "এপস্টাইন ফাইলে বাংলাদেশের নাম উঠে আসা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় নয়। কারণ সেখানে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়ন ও বিনিয়োগের প্রসঙ্গে এসেছে। তবে সরকারের উচিত এই বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা।"
এপস্টাইন ফাইলের প্রকাশনা বিশ্বজুড়ে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের নাম জড়ানো নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি বাংলাদেশের বৈশ্বিক উন্নয়ন অংশীদারিত্বেরই একটি প্রতিফলন, অপরাধমূলক কার্যক্রমের নয়। তবে বিষয়টি নিয়ে সরকার সতর্ক পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: মার্কিন আদালতের নথি, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞ সাক্ষাৎকার