
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে 'হ্যাঁ' ভোট জয়ী হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, 'হ্যাঁ' ভোট পেয়েছে ৬৯ লাখ ২৬ হাজার ১৯৮টি, বিপরীতে 'না' ভোট পেয়েছে ৩৬ লাখ ৬৬ হাজার ৪১টি। এই ব্যবধান ৩২ লাখ ৬০ হাজার ১৫৭ ভোট।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ শেষে গণভোটের এ ফলাফল ঘোষণা করা হয়। 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে প্রায় ৬৫ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। মোট ভোটের এই অনুপাত সংবিধান সংস্কারের পক্ষে জনমতের স্পষ্ট রায় বলে বিবেচিত হচ্ছে।
সারা দেশে 'হ্যাঁ' ভোট বিপুল ব্যবধানে জয়ী হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের চারটি আসনে 'না' ভোট জয়ী হয়েছে। আসনগুলো হলো— বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম-১৩।
বান্দরবানে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ৭১ হাজার ৪১৭টি, বিপরীতে 'না' ভোট পড়েছে ৯০ হাজার ১৫৬টি। রাঙামাটিতে 'হ্যাঁ' পেয়েছে ৭১ হাজার ৬৯৯টি, 'না' পেয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮০৫টি। খাগড়াছড়িতে 'হ্যাঁ' ভোট ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৫৫টি, 'না' ভোট ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৪২টি। চট্টগ্রাম-১৩ আসনে 'হ্যাঁ' ভোট ৮০ হাজার ৫৮০টি, 'না' ভোট ১ লাখ ২৪ হাজার ৬২৯টি।
পার্বত্য অঞ্চলে 'না' ভোট জয়ের কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা জুলাই সনদে প্রস্তাবিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পুনর্বিন্যাস ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সৃষ্ট আশঙ্কাকে চিহ্নিত করছেন।
এই গণভোটে ভোটারদের জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫–এর প্রতি সম্মতি জ্ঞাপনের প্রশ্ন করা হয়। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই সংস্কার কমিশন গঠন করে।
গণভোটের ব্যালট পেপারে চারটি মূল প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল: নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা প্রবর্তন, সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ এবং ৭০ অনুচ্ছেদ বিলুপ্তিসহ ৩০টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব।
জুলাই সনদ পাস হলে সংবিধানে ৪৭টি পরিবর্তন আনা হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— বাংলার পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রচলিত সকল মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি, জাতীয়তা হিসেবে 'বাঙালি'-র পরিবর্তে 'বাংলাদেশী' প্রতিস্থাপন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতি পরিবর্তন করে 'সামাজিক সাম্য', 'মানবিক মর্যাদা', 'সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি'র মতো নতুন মূল্যবোধ সংযোজন।
এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে যুক্ত হচ্ছে। জরুরি অবস্থা ঘোষণায় প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা সীমিত করে মন্ত্রিসভা ও বিরোধীদলীয় নেতার অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হবে।
গণভোটের এই ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন। তিনি বলেন, "আজকের ঐতিহাসিক ভোট গ্রহণের শুভসূচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্রায়ণের ট্রেনে উঠে গেছে। গণতন্ত্রের এই ট্রেন স্টেশনে পৌঁছাবে, এটা আমরা দৃঢ় বিশ্বাস করি"।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ভোট প্রদান শেষে সাংবাদিকদের বলেন, "আজ নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন। আজ আমার জীবনের মহাআনন্দের দিন। দুঃস্বপ্নের অবসান, নতুন স্বপ্নের শুরুর দিন। সবাইকে ঈদ মোবারক"।
গণভোটের ফলাফল নিয়ে এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামী। তবে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে। এরপর ১৭ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।
গণভোটের এই ফলাফল এখন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের কাছে চূড়ান্ত পর্যালোচনার অপেক্ষায় রয়েছে। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে এই গণভোটের ফল বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত হবে বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে