
মনির হোসেন, বেনাপোল প্রতিনিধি: আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, পহেলা ফাল্গুন, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস—এই চার বড় উপলক্ষকে সামনে রেখে এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন দেশের ফুলের রাজধানী খ্যাত যশোরের গদখালীর ফুলচাষিরা। একদিকে বিপুল বিক্রির সম্ভাবনা, অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার আশঙ্কায় কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে এ অঞ্চলের হাজারো চাষি ও ব্যবসায়ীর।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর ঠিক পরদিনই পহেলা ফাল্গুন ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। সাধারণত নির্বাচনের সময় প্রার্থীর বরণ, পথসভা ও বিজয় মিছিলে গাঁদা ও রজনীগন্ধার ব্যাপক চাহিদা থাকে। আবার বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসে গোলাপ ও জারবেরার বাজার থাকে তুঙ্গে। কিন্তু নির্বাচনের দিন বা তার পরবর্তী সময়ে যদি কোনো ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তবে বাজারে ধস নামার আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ও পানিসারার মাঠ এখন রঙিন ফুলে ভরে উঠেছে। গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা ও চন্দ্রমল্লিকার সুবাসে বাতাস মউ মউ করছে। বড় বাজারের আশায় চাষিরা দিনরাত পরিশ্রম করছেন।
চাষি রওশন আলী জানান, "বর্তমানে যে গোলাপ ৫-৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, উৎসবের বাজারে তা ১৫-২৫ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে ১২ তারিখ নির্বাচনের কারণে ঐদিন বাজার বসবে না। ১১ তারিখেও কতটুকু বেচাকেনা হবে তা নিয়ে আমরা সংশয়ে আছি।"
বৃহস্পতিবার সকালে গদখালী বাজারে দেখা যায়, ভোরেই চাষিরা বাইসাইকেল ও ভ্যানে করে ফুল নিয়ে হাজির হয়েছেন। বাজারে বর্তমান দরদাম:
গোলাপ: ৫ - ৭ টাকা (প্রতি পিস)
রজনীগন্ধা: ৮ - ১৫ টাকা
জারবেরা: ৮ - ১০ টাকা
গাঁদা: ১০০ টাকা (প্রতি হাজার)
গ্লাডিওলাস: ৬ - ৮ টাকা
চাষি সাইফুল ইসলাম ও ইসমাইল হোসেন বলেন, বর্তমানে গোলাপ ও গাঁদার দাম কিছুটা কম হলেও অন্য ফুলের দাম উর্ধ্বমুখী। তারা আশা করছেন, রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল থাকলে সামনের সপ্তাহে দাম আরও বাড়বে।
গদখালী ফুল চাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর জানান, চলতি মৌসুমে শতকোটি টাকার বেশি ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে এবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের (২১ ফেব্রুয়ারি) আগেই ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে পবিত্র মাহে রমজান শুরু হতে পারে। রমজানের কারণে উৎসবের আমেজ ও অনুষ্ঠান সীমিত হয়ে পড়লে ফুলের চাহিদা কমে যাওয়ার একটি শঙ্কাও রয়েছে।
যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের উপপরিচালক মোশারফ হোসেন বলেন, "যশোর অঞ্চলে প্রায় ৬৪১ হেক্টর জমিতে ১৩ ধরনের ফুলের বাণিজ্যিক চাষ হয়, যা দেশের মোট চাহিদার ৭০ শতাংশ পূরণ করে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এবং পরিবহন ব্যবস্থা সচল থাকলে এবার রেকর্ড পরিমাণ ফুল বিক্রি হতে পারে, যা চাষিদের সারা বছরের লাভ-লোকসানের হিসাব মিলিয়ে দেবে।"
সব মিলিয়ে গদখালীর ফুলচাষিদের ভাগ্য এখন নির্ভর করছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী পরিবেশ এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে কয়েকশ কোটি টাকার ফুল হাতবদল হবে এই জনপদে, অন্যথায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন প্রান্তিক চাষিরা।