
শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ
উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ছিল আধুনিক সড়ক, টেকসই ড্রেন, ফুটপাত ও আলোকিত নগর। কিন্তু বাস্তবে সেই উন্নয়নকাজই এখন শেরপুর পৌরবাসীর দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ১৭ কোটি ২৪ লাখ টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক খুঁড়ে ড্রেন নির্মাণ শুরু করা হলেও কয়েক মাস ধরে কাজ কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজারো মানুষ।
পৌরসভার নথি অনুসারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে রিজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (RUTDP)-এর আওতায় পৌর এলাকায় রাস্তা কার্পেটিং, আরসিসি ড্রেন, ফুটপাত ও স্ট্রিটলাইট নির্মাণের জন্য ১৭ কোটি ২৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৮ টাকা ৪৬ পয়সার চুক্তি করা হয়। কাজটি পটুয়াখালীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড মিজানুর আলম জেভি পায়। ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর শুরু হওয়া এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৬ সালের ৯ নভেম্বর।
প্রকল্পের সময়সীমার উল্লেখযোগ্য অংশ পেরিয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি নিয়ে সন্তুষ্ট নয় পৌর কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এখন পর্যন্ত মোট কাজের প্রায় ৫ শতাংশও সম্পন্ন হয়নি। খোন্দকারপাড়া ও গোসাইপাড়া ভূমি অফিসসংলগ্ন এলাকায় ড্রেন খননের পর দীর্ঘ সময় ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তার একপাশ কেটে গভীর ড্রেন খনন করা হয়েছে। কোথাও নির্মাণসামগ্রী পড়ে আছে, কোথাও কাদা ও ভাঙা অংশে চলাচল প্রায় অসম্ভব। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কটি পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। ড্রেনের পাশে কোনো কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় পথচারী, মোটরসাইকেল ও রিকশাচালকেরা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এই সড়কের পাশেই রয়েছে সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয়, থানা, উপজেলা ভূমি অফিস, ক্লিনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রধান বাজার, মসজিদ এবং অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষের যাতায়াত হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে সেই জনস্বার্থের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এক মাস নয়, কোথাও কোথাও দুই থেকে তিন মাস ধরে ড্রেন খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে বাড়িতে প্রবেশ, দোকানে মালামাল ওঠানামা এবং পানি নিষ্কাশন সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে। কয়েকটি স্থানে ড্রেনের পাশে মাটি ধসে সীমানাপ্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
গোসাইপাড়ার বাসিন্দা ফারুক বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চলাচল করেন। কিন্তু ড্রেন খুঁড়ে রেখে চলে যাওয়ায় মানুষ প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।’
তালতলা এলাকার বাসিন্দা তবিবর রহমান বলেন, ‘ঠিকাদার কাজ শুরু করে আর ফিরে আসেনি। রিকশাও ঠিকমতো চলতে পারে না। আমরা দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানাই।’
ব্যবসায়ী সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ড্রেন খুঁড়ে রাখার কারণে ব্যবসা প্রায় অচল হয়ে গেছে। ক্রেতারা আসতে চান না। অথচ কাজও হচ্ছে না।’
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড মিজানুর আলম জেভি-এর প্রতিনিধির সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে কাজে বিলম্বের কারণ জানা যায়নি।
শেরপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) শফিকুল ইসলাম (শামিম) বলেন, ‘ঠিকাদারকে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য ইতোমধ্যে তিনটি লিখিত পত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সন্তোষজনক সাড়া না পাওয়ায় চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। আশা করছি খুব শীঘ্রই ঠিকাদাররা কাজ করবে। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি কাজ হলে বর্তমান যে সমস্যাগুলো আছে তা দূর হবে এবং জনদুর্ভোগ কমবে।’
পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, ‘বেশকিছুদিন যাবৎ কাজটি বন্ধ আছে এতে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা এবং মাননীয় জাতীয় সংসদ সদস্য নিজেও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। যাতে ঠিকাদাররা যথা সময়ে কাজটি সম্পূর্ণ করে মানুষকে জনদুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে।’
প্রশ্ন উঠেছে, তিন দফা তাগাদা ও চূড়ান্ত নোটিশের পরও যদি কাজে গতি না আসে, তাহলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?