
নিউজ ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক চাঞ্চল্যকর দাবি করে জানিয়েছে, তারা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় লক্ষ্য করে ‘খাইবার শিকান’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
হামলার পরপরই ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, নেতানিয়াহুর বর্তমান অবস্থা ‘অস্পষ্ট’। তবে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই হামলার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠলিক নিশ্চিতকরণ বা নেতানিয়াহুর অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এই প্রাণঘাতী সংঘাতের সূত্রপাত একটি যৌথ মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেয়ী নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ইরানের অভ্যন্তরে গত তিন দিনের হামলায় অন্তত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইরানের অভ্যন্তরে এ পর্যন্ত ১ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
এই হত্যার প্রতিশোধ নিতে তেহরান এবং তাদের মিত্র বাহিনীগুলো ইসরাইলের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্র দেশ ও সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে।
ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন মিত্র দেশগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে:
সৌদি আরব: রিয়াদের মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলার পর দেশটির পূর্বাঞ্চলের বিশ্বের বৃহত্তম তেল শোধনাগার 'রাস তানুরা'য় ড্রোন হামলা চালায় ইরান। ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন লাগায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকো শোধনাগারটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার ছাড়িয়েছে।
কুয়েত: দেশটির আকাশসীমায় একাধিক মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। সামাজিক মাধ্যমে একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান দাবি করেছে, তারা আলি আল-সালেম ঘাঁটিতে ১৫টি ক্রুজ মিসাইল হামলা চালিয়ে বিমানগুলো ধ্বংস করেছে।
বাহরাইন: রাজধানী মানামার সালমান বন্দরে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে, যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিট অবস্থিত।
কাতার: রাজধানী দোহায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। গ্যাস উৎপাদন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়। ইরান প্রণালীটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না করলেও চলমান হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ ইসরাইলের বিরুদ্ধে রকেট ও ড্রোন হামলা শুরু করায় সংঘাত আরেকটি মাত্রা পেয়েছে। এর জবাবে ইসরাইল লেবাননের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে, যাতে কমপক্ষে ৫২ জন নিহত এবং ১৫৪ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় লেবানন এখন ইরান-ইসরাইল সংঘাতের ‘দ্বিতীয় ফ্রন্ট’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী দেশটির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রসি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন যে, এ সংঘাতের ফলে যেকোনো ধরনের তেজস্ক্রিয় নিঃসরণ বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুক্তরাজ্য তার নীতিতে এক ‘বড় পরিবর্তন’ এনে যুক্তরাষ্ট্রকে সাইপ্রাস, গ্লুচেস্টারশায়ারের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড এবং ভারত মহাসাগরের দিয়াগো গার্সিয়াসহ নিজেদের কৌশলগত বিমান ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব নির্দিষ্ট ও সীমিত প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্যে’ এই ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের নিরাপত্তা সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, ইরানে প্রথম দফার হামলার আগে কয়েক মাস ধরে সিআইএ ইরানের শীর্ষ নেতাদের নিবিড় নজরদারিতে রেখেছিল। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরুর গুঞ্জন প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনায় বসবে না ইরান।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান এখন তার সামরিক কৌশল পরিবর্তন করে মার্কিন মিত্র দেশগুলোর বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানছে। তাদের বার্তা স্পষ্ট, হামলা অব্যাহত রাখলে মিত্র দেশগুলোকে এর মাশুল গুনতে হবে। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।