এনাম হক, শেরপুর, বগুড়া --
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সিমাবাড়ি ইউনিয়নের বেটখৈর গ্রামের একটি পাঠাগারে তখন বাড়তে থাকে শিশু-কিশোর ও তরুণদের ভিড়। কেউ ডুবে থাকে গল্পের বইয়ে, কেউ পড়ে ইতিহাস কিংবা মনীষীদের জীবনী। কেউ আবার খুঁজে নেয় ধর্মীয় বই। মুঠোফোনে গেম খেলা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানোর বদলে তাদের অনেকের অবসর কাটছে বইয়ের পাতায়।
গ্রামের এই পাঠাগারের নাম শেখ নূর মুহাম্মাদ স্মৃতি পাঠাগার। চারপাশের ব্যস্ততার বাইরে বই পড়ার এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে ২০২২ সালে উদ্যোগ নেন শিক্ষক ও নিকাহ নিবন্ধক কাজী মুহাম্মাদ আলমগীর হোসাইন। কয়েকজন তরুণকে সঙ্গে নিয়ে মাত্র ৫০০ বই দিয়ে শুরু করেছিলেন যাত্রা। চার বছরে সেই সংগ্রহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় চার হাজারে।
পাঠাগারটির বইয়ের তাকজুড়ে রয়েছে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, বিজ্ঞান, ইতিহাস, চিকিৎসা ও ধর্মীয় বিষয়ক বই। প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত পাঠাগারটি খোলা থাকে। গড়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ জন পাঠক এখানে আসেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ ও বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
বাবার চাপে আসা, এখন নিজের আগ্রহে
পাঠাগারের নিয়মিত পাঠক তামিমের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়ার গল্প। শুরুতে বাবার চাপে পাঠাগারে আসত সে। পরে বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে পড়তে বদলে যায় তার অভ্যাস।
তামিম বলে, ‘প্রথমে বাবার চাপে এখানে আসতাম। পরে বিভিন্ন বই পড়ে ভালো লাগতে শুরু করে। এখন নিজে থেকেই আসি। মুঠোফোনের দিকে তাকিয়ে থাকার চেয়ে বই পড়তে বেশি আনন্দ লাগে।’
তামিমের মতো আরও অনেক তরুণের অবসর কাটানোর জায়গা হয়ে উঠেছে পাঠাগারটি। এখানে এসে তাঁরা বই পড়ার পাশাপাশি নতুন বিষয় জানার সুযোগ পাচ্ছেন। পাঠাগারের উদ্যোক্তাদের আশা, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস তরুণদের চিন্তাভাবনা ও জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে সহায়তা করবে।
পাঠাগারটির প্রতিষ্ঠাতা কাজী মুহাম্মাদ আলমগীর হোসাইন বলেন, ‘মানুষকে আলোকিত করার লক্ষ্য নিয়েই পাঠাগারটি করেছি। আমরা চাই, শিশু-কিশোরেরা বই পড়ুক, জানার পরিধি বাড়াক।’
গ্রন্থাগারিক হারুন রশিদও পাঠাগারটির কার্যক্রমে তরুণদের আগ্রহ দেখতে পাচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, পাঠাগার প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখানে অনেক তরুণ আসছেন। তাঁদের মধ্যে মুঠোফোন ও মাদকের আসক্তি থেকে বেরিয়ে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
বই পড়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আয়োজন
পাঠাগারটি শুধু বই পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। জাতীয় দিবস পালন ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন উদ্যোক্তারা। গত মাসে সেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে নজরুলজয়ন্তী উৎসব।
পাঠাগারটি পরিদর্শন করেছেন শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু। তিনি এর উন্নয়নে সহযোগিতাও দিয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ে পাঠাগারটির এমন উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে আশাবাদী উপজেলা প্রশাসন।
লক্ষ্য ১০ হাজার বই, প্রয়োজন অবকাঠামো
পাঠক বাড়লেও পাঠাগারটির সামনে রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা। বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন বই রাখার র্যাক, আলমারি ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা। বিদ্যমান সংগ্রহ প্রায় চার হাজার থেকে বাড়িয়ে অন্তত ১০ হাজারে উন্নীত করতে চান উদ্যোক্তারা।
এ লক্ষ্যে বাংলা একাডেমি থেকে প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের এক সেট বই কেনার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন অর্থ ও সহযোগিতা।
শুধু বেটখৈর গ্রামেই নয়, ইউনিয়ন পর্যায়েও পাঠাগার গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু। তিনি বলেন, ‘গ্রাম পর্যায়ে পাঠাগার গড়ে তোলা একটি ভালো উদ্যোগ। বই পড়া থেকে আমরা অনেকটা দূরে সরে গিয়েছি। সে কারণে সামাজিক অস্থিরতা, মাদক বা অন্যান্য খারাপ নেশার প্রতি আসক্তি বাড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেক ইউনিয়নে ছোট পরিসরে হলেও একটি করে পাঠাগার করা এবং উপজেলা পরিষদের মধ্যেও একটি পাঠাগার করার পরিকল্পনা আছে। তাহলে তরুণ প্রজন্ম বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হবে। আশা করি, সবার সহযোগিতা নিয়ে এটি করতে পারব।’
বেটখৈর গ্রামের শেখ নূর মুহাম্মাদ স্মৃতি পাঠাগারে প্রতিদিনের এই আসা-যাওয়া আর বই পড়ার দৃশ্য যেন একটি সম্ভাবনার কথা বলে। হাতে মুঠোফোনের বদলে বই তুলে নেওয়ার অভ্যাস তৈরি হলে গ্রামের শিশু-কিশোর ও তরুণদের জগৎ আরও বিস্তৃত হতে পারে। চার হাজার বই নিয়ে শুরু হওয়া পাঠাগারটির উদ্যোক্তারা এখন সেই পরিসর আরও বড় করার স্বপ্ন দেখছেন।