bogra times Add
ঢাকাবুধবার , ২৫ মার্চ ২০২৬

বগুড়ায় ঐতিহ্যের চাকায় ঘুরছে জীবিকা, ঘোড়ার গাড়িতে আলু পরিবহন

এনাম হকঃ-
মার্চ ২৫, ২০২৬ ৭:৪১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

 এনাম হক, শেরপুর (বগুড়া) থেকে ফিরেঃ

প্রযুক্তি আর যন্ত্রচালিত পরিবহনের বিস্তারে বদলে গেছে গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা। তবে সেই পরিবর্তনের ভেতরেও বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কিছু এলাকায় এখনো আলু পরিবহনের নির্ভরতা রয়ে গেছে ঘোড়ার গাড়ির ওপর। শত বছরের এই পদ্ধতি আঁকড়ে ধরে জীবিকা চালিয়ে যাচ্ছেন বহু মানুষ।

উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের তিলকাতলা ভদ্রা নদীপাড়ে গিয়ে দেখা যায়, আলু তোলার মৌসুমে জমে উঠেছে ব্যস্ততা। মাঠ থেকে ওঠা আলুর বস্তা সারি করে তোলা হচ্ছে ঘোড়ার গাড়িতে। কাদা–পানির পথ পেরিয়ে সেই আলু পৌঁছাচ্ছে পাকা সড়কে। সেখান থেকে ট্রাকে করে যাচ্ছে হিমাগার কিংবা দেশের নানা প্রান্তে। বোর্ডেরহাট এলাকাতেও একই চিত্র।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্তত ছয় থেকে সাত বছর ধরে সংগঠিতভাবে আলু বহনের কাজে যুক্ত কয়েকটি দল। বর্তমানে এ অঞ্চলে প্রায় সাতটি ঘোড়ার গাড়ির দল সক্রিয়।

রাশেদ তাঁদেরই একজন। দুই বছর ধরে এই পেশায় আছেন তিনি। একটি ঘোড়ার গাড়িতে ১৫ থেকে ১৬ মণ আলু বহন করা যায় জানিয়ে বলেন, “৬৫ কেজির একটি বস্তা বহনে আমরা ৬০ টাকা পাই। পুরো মৌসুম মিলিয়ে বছরে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হয়।” এই আয়েই পরিবারের খরচ চালান তিনি। “ছেলেমেয়েদের নিয়ে মোটামুটি ভালোই আছি,” যোগ করেন রাশেদ।

বগুড়ায় ঐতিহ্যের চাকায় ঘুরছে জীবিকা, ঘোড়ার গাড়িতে আলু পরিবহন

এই পেশায় যুক্তদের অনেকেই স্থানীয় নন। মৌসুম এলে আশপাশের জেলা থেকে এসে জড়ো হন তাঁরা। নাটোরের সিংড়া, পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া, বগুড়ার ধুনট, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও কাজিপুর—এসব এলাকা থেকে শ্রমিকেরা দল বেঁধে এখানে কাজ করতে আসেন।

শ্রমিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানালেন, ঘোড়ার গাড়ির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক বহু দিনের। “আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এই গাড়ির প্রচলন। আগে ধান মাড়াইয়ের কাজে ব্যবহার হতো, এখন আলু বহন করি,” বলেন তিনি। তবে তাঁর কণ্ঠে শঙ্কাও আছে, “এখন ট্রাক–টলির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এতে আমাদের এই ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।”

ঘোড়ার গাড়ির কিছু বাস্তব সুবিধাও আছে। কাদা বা পানিপূর্ণ জমিতে যেখানে ট্রাক বা অন্য যানবাহন চলতে পারে না, সেখানে সহজেই চলতে পারে এই গাড়ি। তাই অনেক কৃষক এখনো এদের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে কম খরচও একটি বড় কারণ। এ অঞ্চলে সাইকেলেও আলু বহনের প্রচলন রয়েছে।

শ্রমিকেরা জানান, প্রতিটি দল মৌসুমে প্রায় ৫০ হাজার বস্তা আলু বহন করে। একটি ঘোড়ার পেছনে প্রতিদিন খাবার ও পরিচর্যায় খরচ হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। তবু খরচ কম হওয়ায় এবং কাজের সুযোগ থাকায় এই পেশা ধরে রেখেছেন তাঁরা। এ অঞ্চলে রাশেদের মতো প্রায় শতাধিক মানুষ এই কাজের সঙ্গে জড়িত।

অন্যদিকে, আলুর বাজার পরিস্থিতি নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। মৌসুমের শুরুতে মাঠ থেকেই আলু বিক্রি হয়েছে মাত্র ৬ টাকা কেজি দরে। বর্তমানে সেই দাম বেড়ে ১২ থেকে ১৩ টাকায় উঠেছে। এতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও কৃষকেরা বলছেন, লাভের বড় অংশই চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৭৮০ হেক্টরে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ হাজার মেট্রিক টন।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দার জানান, উপজেলায় পাঁচটি কোল্ড স্টোরেজে মোট ৩৩ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি অনেক কৃষক স্থানীয় পদ্ধতিতেও আলু সংরক্ষণ করছেন।

গ্রামীণ জীবনের এই বাস্তবতায় ঘোড়ার গাড়ি শুধু একটি পরিবহন নয়, বরং নির্ভরতার প্রতীক। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই পেশা কতদিন টিকে থাকবে, সেই প্রশ্ন এখনো অনিশ্চিত।