
বাজারে পণ্যের দাম নিয়ে কারসাজি, ব্যবসায়িক যোগসাজশ ও প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করার মতো কর্মকাণ্ড ঠেকাতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ২০১২ সালের প্রতিযোগিতা আইন সংশোধনের খসড়া প্রকাশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালানো, নথিপত্র ও ডিজিটাল তথ্য জব্দ করা এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ঘটনায় শাস্তির বিধান যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খসড়ার ওপর আগামী এক মাস মতামত দেওয়া যাবে। মতামত পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকের পর সংশোধনী চূড়ান্ত করা হবে।
তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতা
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, কমিশনের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোনো স্থান, ভবন, কক্ষ বা অফিসে প্রবেশ করে তল্লাশি চালাতে পারবেন। তদন্তের প্রয়োজনে হিসাবের খাতাপত্র, বই, কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক তথ্য, সফটওয়্যারসহ সংশ্লিষ্ট নথি ও বস্তু জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন।
জব্দ করা বস্তু নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সাময়িকভাবে কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। প্রয়োজনে কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী সেগুলো ফেরত দেওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে কোর্টস অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট, ১৮৯৮-এর প্রাসঙ্গিক বিধান প্রয়োগের সুযোগ রাখার প্রস্তাবও রয়েছে। তল্লাশি ও জব্দের সময় অন্তত দুজন সাক্ষীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, তদন্তের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যেই এ ক্ষমতা যুক্ত করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্র, কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করে প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ সংগ্রহে এ বিধান কাজে লাগবে।
সিন্ডিকেট ও ডিজিটাল কারসাজি
বর্তমান আইনে কোনো একক প্রতিষ্ঠান বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে প্রতিযোগিতায় বাধা দিলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সংশোধনীতে একাধিক প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে বা সিন্ডিকেট করে বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলে তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া ডিজিটাল বাজারে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করার বিভিন্ন কৌশল আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রাহকের তথ্য নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে বাজারে প্রবেশে বাধা দেওয়া এবং স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দাম নির্ধারণের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় বিরূপ প্রভাব ফেলার মতো কর্মকাণ্ডও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
ডিজিটাল বাজারে কারসাজি শনাক্ত করা এবং কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে খসড়ায়।
জরিমানা ও শাস্তি বাড়ানোর প্রস্তাব
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে প্রতিযোগিতাবিরোধী চুক্তি বা কর্তৃত্বমূলক অবস্থানের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ওই কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিগত তিন অর্থবছরের গড় টার্নওভারের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত প্রশাসনিক জরিমানা আরোপ করা যাবে।
যোগসাজশের ক্ষেত্রে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে চুক্তির মাধ্যমে অর্জিত মুনাফার তিন গুণ অথবা বিগত তিন অর্থবছরের গড় টার্নওভারের ১০ শতাংশের মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ জরিমানা করার প্রস্তাব রয়েছে।
জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রতিদিনের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কমিশনের আদেশ বা নির্দেশনা যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া অমান্য করলে সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড অথবা প্রতিদিনের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে। আর কমিশনের কর্মকর্তাদের তল্লাশি, তলবসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে বাধা দেওয়া বা নির্দেশ অমান্য করলে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন, প্রতিযোগিতা কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁরা হতাশ। এ কারণে প্রতিযোগিতা আইন সংশোধনের বিষয়ে তাঁদের অনেক প্রস্তাব ছিল। তাঁর মতে, আইনের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি কমিশনের কর্মকর্তাদের উদ্যোগ ও কার্যকর ভূমিকারও ঘাটতি রয়েছে।
এস এম নাজের হোসেন বলেন, আইনের যেসব সীমাবদ্ধতার কথা কমিশন এত দিন বলে আসছিল, সংশোধনের মাধ্যমে সেগুলো দূর করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে কমিশনকে আরও জনমুখী ও কার্যকর করতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমানে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে। এতে প্রতিষ্ঠানটি যথাযথভাবে কার্যকর হতে পারছে না।
তিনি আরও বলেন, কমিশনের অন্যতম সমস্যা হলো, তারা ঠিকমতো তদন্ত করতে পারে না। কিছু ক্ষেত্রে লোক দেখানোভাবে জরিমানা ঘোষণা করা হয়। পরে মন্ত্রণালয় বা আদালত পর্যায়ে গিয়ে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে যায়। এতে সরকারি অর্থের অপচয় হয় এবং অনিয়ম বা অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরাও এসব সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেন না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও কমিশনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রতিবেশী দেশগুলোর অনুরূপ আইন অনুসরণ করে প্রতিযোগিতা আইনকে সময়োপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশোধনীতে কিছু অপ্রয়োজনীয় বিষয় বাদ দেওয়ার পাশাপাশি নতুন বিধান যুক্ত করা হবে। তাঁদের আশা, আইন সংশোধন হলে কমিশনের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। তবে প্রস্তাবগুলো এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। মতামত পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শেষে আইন সংশোধনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।