
অন্তর্বর্তীকালীন ডেস্ক: রামনবমীর মিছিলকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে উত্তেজনা ও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। মহারাষ্ট্রের আহিল্যানগরে মসজিদের সামনে উস্কানিমূলক আচরণের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে মুসলিমদের দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
আহিল্যানগরে রামনবমীর একটি মিছিলের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গত ২৭ মার্চের সেই ভিডিওতে দেখা যায়, গেরুয়া স্কার্ফ পরিহিত এক যুবক হাসিমুখে একটি মসজিদের দিকে প্রতীকীভাবে তীর নিক্ষেপ করছেন। মিছিলে উপস্থিত জনতা এই কর্মকাণ্ডে উল্লাস প্রকাশ করলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।
সমালোচকরা মসজিদের খুব কাছ দিয়ে মিছিলের রুট নির্ধারণ এবং এই ধরনের উস্কানিমূলক আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। স্থানীয়দের মাধ্যমে কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেলেও পুলিশ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করেনি।
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর মহকুমার ফালতলায় রামনবমীর মিছিল চলাকালীন ভয়াবহ সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। অভিযোগ উঠেছে, উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত একদল উন্মত্ত জনতা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও দোকানপাটে হামলা চালায় এবং বেশ কিছু দোকানে অগ্নিসংযোগ করে।
মসজিদ থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে যখন শুক্রবার জুমার নামাজ চলছিল, তখন উচ্চস্বরে গান-বাজনা সহ মিছিলটি সেখানে পৌঁছায়। মুসল্লিরা নামাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মিছিলটি থামানোর অনুরোধ করলে বিতণ্ডার সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, উন্মত্ত জনতা মুসলিমদের বাড়ির ছাদে উঠে গেরুয়া পতাকা উত্তোলন করে এবং ভাঙচুর চালায়।
পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতেই দীর্ঘ সময় ধরে এই তাণ্ডব চলে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
এই হামলায় আব্দুল শেখ নামে এক পৌরকর্মী লোহার রডের আঘাতে গুরুতর আহত হন এবং তার মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আহত ব্যক্তিকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। অবস্থার অবনতি হলে পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কলকাতায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
জঙ্গিপুরের বিধায়ক ও তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী জাকির হোসেন দাবি করেছেন, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি পরিকল্পিতভাবে এই দাঙ্গা বাধিয়েছে। হিন্দু ভোট ব্যাংক একত্রিত করতেই এই সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে, বিজেপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
আহিল্যানগরের শ্রীরামপুর শহরেও রামনবমীর মিছিল একটি দরগা সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে পাথর বৃষ্টির ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগে কেউ বলছেন পাথর মিছিল থেকে ছোড়া হয়েছে, আবার কেউ বলছেন পাশ্ববর্তী এলাকা থেকে আক্রমণ করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে রিজার্ভ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রীরামপুরের ঘটনায় এক ধর্মীয় নেতা এবং আরও ১২ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে। যারা গুজব ছড়াবে বা উস্কানিমূলক পোস্ট দেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা।
উত্তরপ্রদেশ, বিহারসহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে রামনবমীর মিছিল ঘিরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে কয়েকটি জায়গায় সহিংসতার ঘটনা এড়ানো যায়নি বলে জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে সূত্রের খবর। রাজ্যগুলোকে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনও রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রামনবমী ও ঈদুল ফিতর একই সময়ে হওয়ায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা ছিল। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে পুলিশ ও প্রশাসন আগে থেকেই সতর্ক অবস্থানে ছিল। তবে মুর্শিদাবাদের ঘটনা প্রমাণ করছে, সতর্কতা সত্ত্বেও সহিংসতা পুরোপুরি ঠেকানো যায়নি।