
শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বাজারগুলোতে এখন নিম্নমানের ও অননুমোদিত বেকারি পণ্যের বন্যা। পাউরুটি থেকে কেক, বিস্কুট থেকে পেস্ট্রি—কী নেই সেখানে! কিন্তু এসব পণ্যের বেশির ভাগেই নেই উৎপাদনের তারিখ, নেই মেয়াদোত্তীর্ণের সময়সীমা, নেই বিএসটিআইয়ের অনুমোদন। উল্টো নকল লোগো ব্যবহার করে গ্রাহকদের ঠকানো হচ্ছে। এ অবস্থায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র উদ্বেগ।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, তালিকাভুক্ত বেকারি প্রতিষ্ঠান ও মুদি দোকান ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। স্লাইসড ব্রেড, জেলি ব্রেড, ব্রাউন ব্রেড, স্পঞ্জ কেক, কাপ কেক, মাফিন, ডোনাট, কুকিজ, পেস্ট্রি, পেটিস, টোস্ট বিস্কুট, ঘি টোস্ট, সিঙ্গারা, সমুচা, চানাচুর—নানা নামে বেকারি পণ্য বিক্রি হচ্ছে। তবে অধিকাংশ পণ্যেই মান নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য নেই।
পরিদর্শনে দেখা গেছে, অনেক পণ্যের মোড়কে বিএসটিআইয়ের অনুমোদনের লোগো নেই। আবার কয়েকটি কারখানার পণ্যে নকল বিএসটিআই লোগো ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক পণ্যে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ও ঠিকানা থাকলেও উপাদানের তালিকা নেই। পরিচিত কয়েকটি ব্র্যান্ডের পণ্যেও উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ পাওয়া যায়নি। কয়েকটি কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনের চিত্রও দেখা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, একটি পণ্যের জন্য নেওয়া বিএসটিআই সনদ ব্যবহার করে ভিন্ন নামে একাধিক পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান কোনো লাইসেন্স ছাড়াই খাদ্যপণ্য তৈরি করছে। বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদিত রুটি, কেক ও বিস্কুটে অস্বাভাবিক উজ্জ্বল বা গাঢ় রং ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো কারখানায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কেমিস্টের উপস্থিতিও পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার বিভিন্ন অবৈধ বেকারিতে নিম্নমানের খাদ্যপণ্য তৈরি করে হাট-বাজার, মুদি দোকান ও চায়ের দোকানে সরবরাহ করা হয়। অধিকাংশ পণ্যই মোড়কবিহীন অবস্থায় খোলা পরিবেশে বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের সময় বা উপাদান সম্পর্কে কোনো তথ্য ছাড়াই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে এসব পণ্যের বিক্রি।
কম দামে বিক্রি বেশি
বাজারে এসব বিস্কুট ৫০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কম দামের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ এসব পণ্য কিনছেন বলে জানিয়েছেন কয়েকজন দোকানি।
স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অননুমোদিত ও নিম্নমানের বেকারি পণ্যে অতিরিক্ত চিনি, ক্ষতিকর কৃত্রিম রং ও ফ্লেভার ব্যবহার করা হয়। এতে গ্যাস্ট্রিক, লিভারের সমস্যা এবং শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাদ্য গ্রহণের ফলে ডায়রিয়া, আমাশয় ও বদহজমের ঝুঁকিও বাড়ে। দীর্ঘদিন এ ধরনের খাবার খেলে লিভারের ক্ষতি এমনকি ক্যানসারের মতো জটিল রোগের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বগুড়া জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মেহেদি হাসান বলেন, ‘যারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ও লাইসেন্স ছাড়া পণ্য উৎপাদন করছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে। কেউ আইন লঙ্ঘন করলে অভিযানের মাধ্যমে জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বগুড়া জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো. রাসেল বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি ও খাদ্য নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া যাবে, অভিযানের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, ‘খাদ্যপণ্যের মান নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে। অননুমোদিত বা নিম্নমানের খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’