
শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি
সরকারি বিশেষ আর্থিক অনুদান পাওয়ার সময়ই শুধু খুলে রাখা হতো এতিমখানাটি। অনুদানের টাকা উত্তোলন শেষ হলেই আবার ঝুলত তালা। স্থানীয়দের এমন অভিযোগের সত্যতা মিলেছে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার সাম্প্রতিক পরিদর্শনেও। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার একটি নিবন্ধিত এতিমখানায় দীর্ঘদিন ধরে কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষক না থাকলেও গত দুই অর্থবছরে সমাজসেবা কার্যালয় থেকে সরকারি বিশেষ আর্থিক অনুদান হিসেবে ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ ঘটনায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের খুরতা গ্রামের সরকারি নিবন্ধনপ্রাপ্ত মানব উন্নয়ন কেন্দ্র এতিমখানা লিল্লাহ বোর্ডিং (নিবন্ধন নম্বর-১২৪৪/০৭) দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমহীন। প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো ছাত্র ও শিক্ষক নেই। বর্তমানে ভবনটি তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এলাকাবাসীর পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মমিন গত ২৭ জুলাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এর আগে ১৩ জুলাই একই অভিযোগ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কাছেও দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি মো. জুলফিকার আলী ও সহসভাপতি আবু রায়হান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও তাঁরা প্রতিষ্ঠানটির নামে সরকারি অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে উত্তোলন করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারী।
উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শেরপুর উপজেলায় সরকারি বিশেষ আর্থিক অনুদান পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০টি। এর মধ্যে মানব উন্নয়ন কেন্দ্র এতিমখানা লিল্লাহ বোর্ডিং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা সরকারি বিশেষ আর্থিক অনুদান উত্তোলন করেছে। দুই অর্থবছরে মোট উত্তোলিত অর্থের পরিমাণ ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা।
খুরতা গ্রামের বাসিন্দা ইউনুস আলী, রেজাউল করিম ও মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রায় দুই বছর আগে এতিমখানাটি চালু করা হয়। সেখানে সাতজন ছাত্র ছিল বলে তাঁরা শুনেছেন। ছাত্রপ্রতি প্রায় দুই হাজার টাকা হারে বিশেষ আর্থিক অনুদান দেওয়া হতো। বছরে দুই দফায় ছয় মাস অন্তর এ অনুদান আসত। তবে অনুদান আসার আগে কিছুদিন প্রতিষ্ঠানটি খোলা থাকলেও টাকা উত্তোলনের পর আবার সেটি বন্ধ করে দেওয়া হতো। বর্তমানে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো কার্যক্রম নেই। অনুদানের টাকারও কোনো হিসাব তাঁরা জানেন না।
অভিযুক্ত সহসভাপতি আবু রায়হান বলেন, "এ বিষয়টি সভাপতি জানেন।"
অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মো. জুলফিকার আলী জুয়েল বলেন, "আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ম মেনেই পরিচালিত হয়েছে। অনুদানের টাকা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে রয়েছে।"
এ বিষয়ে সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ওবায়দুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নাইম হোসেন বলেন, "চলতি মাসের প্রথম দিকে আমি প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। সে সময় এতিমখানাটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পাই এবং সেখানে কোনো কার্যক্রম চলতে দেখিনি। পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারি, সরকারি অনুদান আসার সময় সাময়িকভাবে কার্যক্রম দেখিয়ে পরে আবার প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।"
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, "অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"