
শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি:
বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় একটি সরকারি নিবন্ধিত এতিমখানা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকলেও তার নামে গত দুই অর্থবছরে সরকারি বিশেষ আর্থিক অনুদান হিসেবে ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষক নেই, ভবনটি তালাবদ্ধ—এমন পরিস্থিতিতে অর্থ উত্তোলনকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন ও ক্ষোভ ছড়িয়েছে।
অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সর্বশেষ বরাদ্দকৃত ২ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে।
উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের খুরতা গ্রামে অবস্থিত মানব উন্নয়ন কেন্দ্র এতিমখানা লিল্লাহ বোর্ডিং (নিবন্ধন নম্বর-১২৪৪/০৭) প্রায় দুই বছর ধরে কার্যক্রমহীন। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে কোনো ছাত্র-শিক্ষক নেই, আর বেশিরভাগ সময় ভবনটি তালাবদ্ধ থাকে।
তা সত্ত্বেও—
২০২৪-২৫ অর্থবছরে উত্তোলন করা হয় ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা
২০২৫-২৬ অর্থবছরে উত্তোলন করা হয় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা
মোট উত্তোলিত অর্থের পরিমাণ ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা
এ বিষয়ে গত ২৭ জুলাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মমিন। এর আগে ১৩ জুলাই একই অভিযোগ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কাছেও জমা দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মো. জুলফিকার আলী ও সহসভাপতি আবু রায়হান তেঁতুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও তাঁরা প্রতিষ্ঠানের নামে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করছেন—এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে।
খুরতা গ্রামের বাসিন্দা ইউনুস আলী, রেজাউল করিম ও মাহবুবুর রহমান জানান, প্রায় দুই বছর আগে এতিমখানাটি চালু করা হয়েছিল। তখন সেখানে সাতজন ছাত্র ছিল। ছাত্রপ্রতি প্রায় দুই হাজার টাকা হারে বিশেষ আর্থিক অনুদান দেওয়া হতো। তবে অনুদান আসার আগে কিছুদিন প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হলেও টাকা উত্তোলনের পর আবার বন্ধ করে দেওয়া হতো। তারা বলেন, "টাকার কোনো হিসাব আমরা পাইনি। এখন তো দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো কার্যক্রমই নেই।"
অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের জন্য উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা—এই তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, "অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ২০২৬ সালের সর্বশেষ বরাদ্দকৃত ২ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ব্যাংকে ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। ওই অর্থ আর উত্তোলন করতে পারবে না তারা। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নাইম ইসলাম জানান, চলতি মাসের প্রথম দিকে তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। "গিয়ে দেখি ভবনটি তালাবদ্ধ। সেখানে কোনো শিক্ষা কার্যক্রম চলছিল না। স্থানীয়রা বলেছেন, অনুদান আসার সময় সাময়িকভাবে কার্যক্রম দেখিয়ে পরে আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।"
শেরপুর জেলার সহকারি পরিচালক (সাবেক উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা) মো. ওবায়দুল হক বলেন, "আমার সময় ওই এতিমখানায় অনেক এতিম ছাত্র ছিল। তবে আমার বদলির পর মুহতামিম ও সভাপতি পরিবর্তন করা হয়েছে। যদি অনিয়ম হয়ে থাকে, আমার সময় তো কেউ অভিযোগ করেনি।"
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মো. জুলফিকার আলী জুয়েল। তিনি বলেন, "২০০৫ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছি। শিক্ষকরা পাশের একটি নতুন মাদ্রাসায় চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরাও সেখানে গেছে। নতুন শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা চলছে। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। সরকারি অনুদানের অর্থ এখনো প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবেই রয়েছে।"
স্থানীয়রা প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া ভবিষ্যতে যাতে কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে এ ধরনের অনিয়ম না হয়, সেজন্য নিয়মিত মনিটরিং ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততার কথাও বলেছেন তারা।