
ঘোষিত বেসরকারি ফলাফল বলছে, ২৯৯ আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৯৩টির ফল প্রকাশিত হয়েছে। বিএনপি ও তার সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা 'ধানের শীষ' প্রতীক নিয়ে জিতেছেন ২০৩টি আসনে। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৭০টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি ৬টি, এবং অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৪টি আসনে জয় পেয়েছেন। মাত্র কয়েকটি আসনের ফল এখনও প্রক্রিয়াধীন।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে গত ২৫ নভেম্বর দেশে ফেরেন তিনি। মাত্র দেড় মাসের মাথায় দাঁড়িয়ে ভোটের ময়দানে নেমে দুই আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন তিনি।
ঢাকা-১৭ আসনে তার ব্যবধান ছিল ৪ হাজার ৩৯৯ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের স ম খালিদুজ্জামানকে হারিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, রাজধানীর ভোটাররাও তাকে গ্রহণ করেছেন। আর বগুড়া-৬ আসনে তিনি পান ২ লাখ ১৬ হাজার ২৮৪ ভোট, প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারান ১ লাখ ১৮ হাজার ৬৫৮ ভোটের বিশাল ব্যবধানে। সেখানেই যেন প্রমাণিত হলো, তার শিকড় এখনও আঁকড়ে আছে তৃণমূলে।
অন্যদিকে ঢাকা-১৫ আসনে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
বিএনপির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। তবে দলকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যান তার সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ ৯ বছর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯১ সালে তিনি হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। এরপর ১৯৯৬ সালে সংক্ষিপ্ত মেয়াদে আবারও সরকার গঠন করে বিএনপি।
সর্বশেষ ২০০১ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় দলটি। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফাপত্র প্রদানের মাধ্যমে সে মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে। তারপর থেকে দীর্ঘ ২০ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল দলটি।
এবার সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটছে। তবে এবার আর নেতৃত্বে নেই খালেদা জিয়া। গত ৩০ ডিসেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এরপর ৯ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটি তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
আশির দশকের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজনীতিতে হাতেখড়ি তারেক রহমানের। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। ১৯৯৩ সালে বগুড়ায় গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু করে তৃণমূলে সাড়া ফেলেন তিনি।
২০০২ সালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ২০১৮ সালে মা কারান্তরীণ হলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তিনি। এরপর থেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।
গত ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে ২৫ নভেম্বর দেশে ফেরেন তিনি। ২৭ নভেম্বর ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। আর আজ তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ— প্রথমবার নির্বাচনে লড়েই দুই আসনে জয়ী, আর তিনিই হচ্ছেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
এবারের নির্বাচনে বিএনপির জয় নিছক একটি রাজনৈতিক দলের জয় নয়। এটি ২০ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। একই সঙ্গে এটি পুরুষ নেতৃত্বে ফিরে যাওয়ার গল্প— ১৯৮৮ সালে কাজী জাফর আহমদের পর দেশ পাচ্ছে পুরুষ প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘ ৩৪ বছর নারী প্রধানমন্ত্রীর শাসনের পর সেই ধারায় এল পরিবর্তন।
আরও বড় কথা, এটি মায়ের হাত থেকে ছেলের হাতে দলের নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার গল্প। খালেদা জিয়া যখন জীবিত ছিলেন না, তখন দাঁড়িয়ে গেলেন তারেক রহমান। আর দাঁড়ালেন শুধু দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবেই নয়, বরং প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও।
২৯৯ আসনের মধ্যে ২০৩টি নিয়ে সরকার গঠনের পথ অনেকটাই পরিষ্কার বিএনপির। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা। দলের সূত্র জানিয়েছে, অচিরেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন তারেক রহমান। দীর্ঘ দুই দশকের ক্ষমতার বাইরে থাকার গ্লানি ঘুচিয়ে বিএনপি এবার নেতৃত্ব দেবে নতুন করে। দেশের ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে নতুন অধ্যায়ের নাম— তারেক রহমানের বাংলাদেশ।