bogra times
ঢাকামঙ্গলবার , ১৩ জানুয়ারি ২০২৬

এক বছরে দেশে বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে ৫৮ শতাংশ

নিউজ ডেস্কঃ-
জানুয়ারি ১৩, ২০২৬ ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ডেস্ক প্রতিবেদক | 

শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশে-বিদেশে নানা সেমিনার ও রোড-শো আয়োজন করা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। উল্টো বিনিয়োগের পরিবেশে উদ্বেগ ও আস্থার সংকটের কারণে সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিনিয়োগ নিবন্ধন বা প্রস্তাবের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ কমে গেছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বিনিয়োগকারীদের ভালো সাড়ার কথা প্রচার করলেও পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। বিশ্লেষকদের মতে, প্রচারণায় গুরুত্ব না দিয়ে বিনিয়োগের মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করাই এখন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

বিনিয়োগের খতিয়ান: কোভিডকালের চেয়েও খারাপ দশা
অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিডার কাছে ৬৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই অংক ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে ৯০ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা বা ৫৮ শতাংশ।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই পতন কোভিডকালীন সময়ের চেয়েও ভয়াবহ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ১ লাখ ৫ হাজার ২২৬ কোটি টাকার। এমনকি ২০২০-২১ সালের কঠিন সময়েও নিবন্ধনের পরিমাণ ছিল ৬৫ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা, যা বর্তমান অর্থবছরের প্রায় সমান। অথচ বিগত কয়েক বছরে জিডিপির আকার বাড়লেও বিনিয়োগ নিবন্ধন জিডিপির মাত্র ২-৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের চিত্র
গত অর্থবছরে মোট নিবন্ধিত প্রস্তাবের মধ্যে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অংশই বড়।

স্থানীয় বিনিয়োগ: ৮০৯টি প্রকল্পে ৫২ হাজার ৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সেবা খাতে সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশ প্রস্তাব এসেছে।

বিদেশি বিনিয়োগ: ১৬১টি প্রকল্পে ১৪ হাজার ২২ কোটি টাকা। বিদেশি বিনিয়োগের বড় অংশ (৫৫%) এসেছে কেমিক্যাল খাতে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, নতুন মূলধন বা ‘ইকুইটি ক্যাপিটাল’ প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশে প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই নতুন মূলধনের হিস্যা বরাবরই কম থাকে।

চীনসহ প্রধান দেশগুলোর বিমুখতা
চীনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ও বিনিয়োগ টানতে বিডার পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের সফর ও সেমিনার আয়োজন করা হলেও আশানুরূপ ফল মেলেনি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে চীন থেকে নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে প্রায় ৮৯ শতাংশ।

দেশভিত্তিক বিনিয়োগ প্রস্তাবে শীর্ষ তালিকায় বড় রদবদল হয়েছে। ২০২৩-২৪ সালে শীর্ষ পাঁচে থাকা জাপান, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব ও জার্মানি এবার তালিকার বাইরে চলে গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮২০ কোটি টাকার প্রস্তাব এসেছে। এরপর রয়েছে চীন (৬২০ কোটি), যুক্তরাষ্ট্র (৪১০ কোটি) ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (৩১০ কোটি)।

উচ্চ সফরের স্বল্প অর্জন
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কাতারসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। তবে এসব দেশের বিনিয়োগ চিত্রে নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। কাতার থেকে কোনো বিনিয়োগ আসেনি, যুক্তরাজ্য থেকে নিট এফডিআই কমেছে ৪০ শতাংশের বেশি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে পরিমাণ বিনিয়োগ এসেছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ প্রত্যাবাসিত (দেশ থেকে চলে গেছে) হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও বিডার ব্যাখ্যা
উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মতে, উচ্চ সুদহার, অসহনীয় মূল্যস্ফীতি এবং তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে বিনিয়োগের পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক বিনিয়োগকারীই এখন একটি নির্বাচিত স্থায়ী সরকারের জন্য ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ (Wait and See) নীতি গ্রহণ করেছেন।

তবে বিনিয়োগ প্রস্তাব কমে যাওয়াকে নেতিবাচকভাবে দেখতে নারাজ বিডা। সংস্থাটির দাবি, এটি কেবল পরিমাণগত হ্রাস নয়, বরং গুণগত স্ক্রিনিংয়ের ফল। বিডা জানায়, গত অর্থবছরে প্রস্তাবিত অংকের তুলনায় বাস্তবায়িত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ এখন যে প্রস্তাবগুলো আসছে, সেগুলো অনেক বেশি বাস্তবসম্মত এবং দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য।