bogra times Add
ঢাকাবৃহস্পতিবার , ২৬ মার্চ ২০২৬

জ্বালানি সংকটের মুখে বাংলাদেশ : অকটেনের মজুত ৮ দিনের, পেট্রোল ১১ দিন

নিউজ ডেস্কঃ-
মার্চ ২৬, ২০২৬ ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

নিউজ ডেস্ক: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর সৃষ্ট বৈশ্বিক অস্থিরতায় জ্বালানি সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো তেল দিতে না পারায় দেশের জ্বালানি মজুত উদ্বেগজনক হারে কমে গেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বেশি চাহিদার জ্বালানি ডিজেলের মজুত দিয়ে মাত্র ১২ দিন চলবে। অকটেনের মজুত ৮ দিনের মতো সীমিত হয়ে এসেছে।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির জটিলতার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, কনডেনসেট সংকট এবং সিন্ডিকেটের কারসাজি—তিনটি কারণ মিলে জ্বালানি খাতকে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

মজুতের চিত্র উদ্বেগজনক

বিপিসি সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে সব মিলিয়ে প্রায় ৪৫ দিনের জ্বালানি তেল মজুতের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমান মজুত সেই সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম। গত ২১ মার্চ পর্যন্ত দেশে মাত্র ১ লাখ ৫২ হাজার ৫৩৯ টন ডিজেল মজুত ছিল। দৈনিক ১২ হাজার ৭৭৭ টন সরবরাহ অনুযায়ী বর্তমান মজুত দিয়ে মাত্র ১২ দিন চলা সম্ভব। অথচ চলতি মার্চ মাসে ডিজেলের চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৮৫০ টনে।

অকটেনের অবস্থা আরও নাজুক। বর্তমানে দেশে মাত্র ৯ হাজার ৮২৯ টন অকটেন মজুত রয়েছে। দৈনিক ১ হাজার ১৯৩ টন সরবরাহ বিবেচনায় মাত্র ৮ দিনের মজুত আছে দেশে। পেট্রোলের মজুত ১৬ হাজার ২২৫ টন, যা দিয়ে চলবে মাত্র ১১ দিন।

ফার্নেস অয়েল দিয়ে আগামী ১৮ দিন ও জেট ফুয়েল দিয়ে ২৪ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। তবে ডিজেল ও অকটেনের সংকট ইতোমধ্যে দেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

পেট্রোল-অকটেন সংকট কেন?

দেশে পেট্রোল ও অকটেনের মূল উৎস কনডেনসেট। প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের সময় উপজাত হিসেবে এই তরল হাইড্রোকার্বন পাওয়া যায়। কিন্তু গত এক বছরে দেশের গ্যাস উৎপাদন প্রতিদিন গড়ে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমেছে। বর্তমানে দেশের ২২টি গ্যাসফিল্ড থেকে দৈনিক ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে, যা গত বছর ছিল ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশের বৃহত্তম গ্যাসফিল্ড তিতাসের উৎপাদন ৩৭৮ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে নেমে ৩১৯ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে।

গ্যাস উৎপাদন কমায় কনডেনসেট উত্তোলনও কমেছে। এর ফলে দেশীয় পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

সিন্ডিকেটের কারসাজির অভিযোগ

তবে গ্যাস উৎপাদন কমাই সংকটের একমাত্র কারণ নয়। পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সরাসরি সিন্ডিকেটের কারসাজির অভিযোগ এনেছেন।

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম অভিযোগ করে বলেন, “ডিপো থেকে পাম্পগুলো চাহিদামাফিক তেল সরবরাহ পাচ্ছে না। পেট্রোল ও অকটেন দেশেই উৎপাদিত পণ্য। তাই এর কৃত্রিম সংকট হওয়ার কোনো কারণ নেই। মূলত আগামী মাসের ১ তারিখে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে, এমন সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বেসরকারি সিআরইউগুলো (কনডেনসেট রিফাইনারি ইউনিট) বিপিসিকে তেল দিচ্ছে না। ফলে এই সংকট বাড়ছে।”

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন বিষয়টিকে সিন্ডিকেটের কারসাজি হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “অকটেন ও পেট্রোল উৎপাদনের উৎস মূলত দুটি—রিফাইনারি ও কনডেনসেট। এখন খতিয়ে দেখা দরকার কোন উৎস থেকে ঠিক কতটুকু তেল পাওয়া যাচ্ছে। অতীতে এই খাতে কখনো এমন ঘাটতি দেখা যায়নি। তাহলে এখন কেন হচ্ছে? কনডেনসেটের একটি অংশ বেসরকারি কোম্পানিগুলো আমদানি করে থাকে। তারা কোনো সিন্ডিকেট বা বাজার ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করছে কি না, সরকারের তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা উচিত।”

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

বাংলাদেশ প্রতি বছর গড়ে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। পাশাপাশি ভারত ও চীন থেকে বছরে প্রায় ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহকারী এই রিফাইনারিগুলোও সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ ভারত ও চীনের এসব রিফাইনারির একটি বড় অংশ ইরান থেকে স্বল্পমূল্যে তেল আমদানি করে। এরপর পরিশোধন করে তারা বাংলাদেশে সরবরাহ করে।

বিপিসির ব্যাখ্যা ও করণীয়

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, “মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে মজুতে কিছুটা টান পড়েছে এটা সত্য। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা কমিয়ে আনা জরুরি।”

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার সুযোগে অধিক মুনাফার আশায় কেউ কেউ মজুতদারি করতে পারে। বাংলাদেশ যেহেতু বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করে, তাই এই পরিস্থিতিতে কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন।

সংকট কাটাতে যা করা জরুরি

পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদে বেসরকারি সিআরইউগুলোর সরবরাহ নিরীক্ষণ ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে ভারত বা চীন থেকে অতিরিক্ত পরিশোধিত তেল আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গ্যাসক্ষেত্রের পুনরুদ্ধার কার্যক্রম জোরদার, জ্বালানি আমদানিতে উৎসের বৈচিত্র্য আনা এবং কনডেনসেট ও পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

আপাতত দেশের জ্বালানি খাত একটি জটিল মোড় পার করছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, দেশীয় উৎপাদন সংকট ও বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি—তিনটি কারণ মিলে সৃষ্ট এই সংকট কাটিয়ে উঠতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপের বিকল্প নেই।

 

সুত্রঃ ঢাকা পোস্ট