bogra times cover image-1
ঢাকাMonday , 12 October 2026

বগুড়ায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪ কৃষক বাজার, দাপট মধ্যস্বত্বভোগীদের

এনাম হকঃ-
October 12, 2026 12:33 am
Link Copied!

এনাম হক,বগুড়া —

কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি পাইকারদের কাছে বিক্রি, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর লক্ষ্য নিয়ে বগুড়ায় তৈরি করা হয়েছিল চারটি গ্রোয়ার্স মার্কেট। এসব বাজারে পণ্য বাছাই, গ্রেডিং, প্যাকিং, ধোয়া ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। ছিল কৃষাণিদের জন্য আলাদা কর্নারও। কিন্তু প্রায় ১৯ বছর পর বাজারগুলোর বেশির ভাগই কৃষকের সেই কাজে আসছে না। কোথাও কৃষকের জন্য বরাদ্দ দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে, কোথাও বাজারের কার্যক্রম সীমিত। আবার কোনো বাজারে কৃষকের বদলে অন্য জেলা থেকে পণ্য কিনে এনে বিক্রি করছেন মহাজনেরা।

বগুড়ার শেরপুর, শাহজাহানপুর ও শিবগঞ্জ উপজেলার এসব বাজার ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে নির্মিত এসব অবকাঠামোয় এখন মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ বেশি। ফলে কৃষকের সরাসরি পণ্য বিক্রির যে উদ্দেশ্য ছিল, তা অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

‘উত্তর-পশ্চিম শস্য বহুমুখীকরণ’ প্রকল্পের (এনসিডিপি) আওতায় ২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে বগুড়ায় চারটি গ্রোয়ার্স মার্কেট নির্মাণ করা হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এসব অবকাঠামো নির্মাণ করে। ২০০৯ সালে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়। উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে কৃষকদের সহায়তা করা ছিল প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য।

কৃষকের দোকান অন্য ব্যবসায়ীদের ভাড়া

শেরপুরে পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) এলাকার পাইকারি গ্রোয়ার্স মার্কেটে কৃষকদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া দোকানগুলো এখন অন্য ব্যবসায়ীদের দখলে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দুই বছর আগেও বাজারটি ভালো চলত। তবে মহাসড়কে ফ্লাইওভার না থাকায় সড়কের আইল্যান্ডের কারণে যানবাহন চলাচল ও পারাপারে সমস্যা হচ্ছে। এতে বাজারের কার্যক্রম কমেছে।

বাজারটিতে বরাদ্দ পাওয়া ১৬ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে ১৫ জনই অন্যত্র ব্যবসা করছেন। স্থানীয় ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের বরাদ্দ পাওয়া দোকানগুলো মুদি দোকান, লুঙ্গির দোকান ও ওষুধের ফার্মেসি হিসেবে অন্যদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

শেরপুরের মির্জাপুর এলাকার গ্রোয়ার্স মার্কেটের অবস্থাও নাজুক। কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি এনে বিক্রি করবেন, এমন ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে তা নেই। সেখানে ছয়জন মহাজন অন্য জেলা থেকে পণ্য কিনে এনে ভবনে বিক্রি করছেন। মার্কেটের বাইরে কাঁচামালের ৩৪টি দোকান রয়েছে। এসব দোকান থেকে প্রতি মাসে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা ভাড়া নেন মহাজনেরা।

মার্কেটের নারী কর্নারও চালু হয়নি। স্থানীয় ব্যবসায়ী মাসুদ রানা, মহাজন আবদুল মান্নানসহ একাধিক ব্যবসায়ী এসব তথ্য জানিয়েছেন।

বগুড়ায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে কৃষক বাজার, দাপট মধ্যস্বত্বভোগীদের

সপ্তাহে দুদিন সচল বাজার

শাহজাহানপুর উপজেলার দুবলাগাড়ী হাটের গ্রোয়ার্স মার্কেটেও কৃষকদের অংশগ্রহণ সীমিত। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সপ্তাহে দুদিন বাজারটি কিছুটা সচল থাকে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সেখানে নারী কর্নার চালু হয়নি। স্থানীয় সদস্য কৃষকদের পরিবর্তে ইজারাদারেরা বাজারটি পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানে পাইকারি সবজির বাজারে কর্মচাঞ্চল্য থাকলেও কৃষকদের জন্য নির্ধারিত উদ্দেশ্য পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এক কৃষকের ভাষ্য, খুচরা বাজারটি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। বাজার কমিটির কার্যক্রমও আগের তুলনায় কম।

কৃষকের জন্য যেসব সুবিধা রাখার কথা ছিল

গ্রোয়ার্স মার্কেটগুলো গড়ে তোলার পরিকল্পনায় ছিল ৩৩ ধরনের উচ্চমূল্যের ফসল, যেমন সবজি, ফল, মসলা ও দানাশস্যের বহুমুখী ও নিবিড় উৎপাদন বাড়ানো। এর মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাজারের এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্য এসব বাজারে এনে বিক্রি করবেন। পরে বড় পাইকারদের মাধ্যমে সেসব পণ্য ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হবে। কৃষকদের এ কাজে দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন ধাপে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল।

বাজারগুলোতে পণ্য বাছাই, গ্রেডিং, প্যাকিং, ধোয়া ও শুকানোর ইউনিট, পণ্য ওঠানো-নামানোর জায়গা, সংরক্ষণাগার, নারী কর্নার, বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যালয় এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্র রাখা হয়। কিন্তু এসব সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বাজারগুলোর কার্যক্রম কৃষককেন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

বগুড়ার সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. মোরশেদ আল মাহমুদ বলেন, ২০০৯ সালে প্রকল্পটি একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কৃষকদের একটি দলের সদস্যদের নিয়ে বাজার পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়। তাঁদের মধ্য থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক সদস্যকে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, বাজারগুলোতে কৃষিপণ্য গ্রেডিং এবং পণ্য ওঠানো-নামানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এসব স্থাপনা সংস্কার করা হলে কৃষকেরা আরও সুবিধা পাবেন। বাজারের সদস্যরাই পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন।

দোকান বরাদ্দ নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে মোরশেদ আল মাহমুদ বলেন, অনেক ব্যবসায়ী আবেদন করেননি। এ কারণে তাঁরা বরাদ্দ পাননি। নিয়ম মেনেই দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বাজারগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নারীদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হবে। কিছু নীতিমালা পরিবর্তন করা গেলে বাজারগুলো আরও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

তবে বাজারগুলোর দোকান অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দেওয়া, কৃষকদের সরাসরি পণ্য বিক্রি কমে যাওয়া এবং নারী কর্নার চালু না হওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে বিস্তারিত পাওয়া যায়নি।

error: Content is protected !!