bogra times
ঢাকাশুক্রবার , ১৬ জানুয়ারি ২০২৬

ইসরা ও মেরাজ: আরশে আজিমে মাহবুবের অভিসার

নিউজ ডেস্কঃ-
জানুয়ারি ১৬, ২০২৬ ১১:৩৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তি জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং অলৌকিক ঘটনা হলো ইসরা ও মেরাজ। এটি কেবল একটি ভ্রমণ ছিল না, বরং এটি ছিল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয় হাবিবের জন্য এক বিশেষ সম্মাননা, সান্ত্বনা এবং সৃষ্টিজগতের রহস্য উন্মোচনের এক মহিমান্বিত অধ্যায়।

আমুল হুজন বা শোকের বছর ও মেরাজের প্রেক্ষাপট

নবুয়তের দশম বছরটি ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য অত্যন্ত কঠিন। মক্কার কুরাইশদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট, প্রিয়তমা স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) এবং পরম শ্রদ্ধেয় চাচা আবু তালিবের মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে ব্যথিত করেছিল। এরপর তায়েফের ময়দানে দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে রক্তরঞ্জিত হওয়া তাঁর দুঃখকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই চরম একাকীত্ব ও কষ্টের মুহূর্তে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে নেন।


সফরের দুটি অংশ: ইসরা ও মেরাজ

এই অলৌকিক সফরটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত ছিল: ১. ইসরা: মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের মসজিদুল আকসা পর্যন্ত নৈশ ভ্রমণ। ২. মেরাজ: মসজিদুল আকসা থেকে ঊর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ এবং মহান আল্লাহর দিদার লাভ।

সফরের অলৌকিক বাহন ও ফেরেশতাদের সঙ্গ

আল্লাহ তাআলা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে জান্নাত থেকে বিশেষ বাহন ‘বোরাক’ পাঠান। এটি ছিল বিদ্যুতগতি সম্পন্ন এক শ্বেতবর্ণের বাহন। মিরাজ শুরুর আগে ‘শক্বে সদর’ বা বক্ষ বিদীর্ণ করার মাধ্যমে রাসুল (সা.)-এর অন্তরকে বিশেষ নূর ও হিকমত দ্বারা পূর্ণ করা হয়, যাতে তিনি মহান রবের নূরানী তাজাল্লি সহ্য করার শক্তি লাভ করেন।


মসজিদুল আকসায় আম্বিয়াদের ইমামতি

মসজিদুল আকসায় পৌঁছে রাসুলুল্লাহ (সা.) সকল নবী ও রাসুলগণের ইমামতি করে দুই রাকাত সালাত আদায় করেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তিনি হলেন ‘সায়্যিদুল মুরসালিন’ বা সকল নবীর সরদার এবং ইসলামই হলো মহান আল্লাহর মনোনীত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান।

সিদরাতুল মুনতাহা ও জিবরাইল (আ.)-এর শেষ সীমানা

সাত আসমান অতিক্রম করার পর রাসুল (সা.) পৌঁছান সিদরাতুল মুনতাহায় (সীমান্তের কুলগাছ)। এটি সৃষ্টিজগতের এমন এক সীমানা যেখানে জিবরাইল (আ.)-এর যাওয়ার অনুমতি ছিল না। সেখান থেকে রাসুল (সা.) একা ‘রফরফ’ নামক বিশেষ বাহনে চড়ে আল্লাহর আরশে আজিমে গমন করেন। পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নাজমে এই মাকামের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।


মেরাজের উপহার: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ

মেরাজের রাতে উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য সবচেয়ে বড় উপহার ছিল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। শুরুতে ৫০ ওয়াক্ত নামাজের নির্দেশ দেওয়া হলেও হজরত মুসা (আ.)-এর পরামর্শে কয়েক দফায় আবেদনের পর আল্লাহ তাআলা তা কমিয়ে ৫ ওয়াক্ত করেন। তবে আল্লাহ ঘোষণা করেন, কেউ যদি নিষ্ঠার সাথে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, তবে তাকে ৫০ ওয়াক্তেরই সওয়াব দান করা হবে। হাদিসে নামাজকে বলা হয়েছে ‘মুমিনের মেরাজ’

পরকাল ও সমাজের চিত্র দর্শন

মেরাজ ভ্রমণে রাসুল (সা.)-কে জান্নাত ও জাহান্নামের কিছু বিশেষ দৃশ্য দেখানো হয়, যা উম্মতের জন্য শিক্ষার মাধ্যম:

  • গিবতকারীর শাস্তি: যারা মানুষের অনুপস্থিতিতে কুৎসা রটাত, তাদের তামাটে নখ দিয়ে নিজের মুখমণ্ডল খামচাতে দেখেন।

  • সুদখোরদের শাস্তি: তাদের পেট ছিল বড় ঘরের মতো, যার ভেতরে সাপ দেখা যাচ্ছিল।

  • আমানত খিয়ানতকারী: এক ব্যক্তিকে দেখা যায় যে একটি বোঝার ভার সইতে পারছে না, অথচ সে তার ওপর আরও বোঝা চাপাচ্ছে।


বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মেরাজের শিক্ষা

অনেকে মেরাজের সময় নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। হজরত উম্মেহানি (রা.)-এর ঘরে যখন রাসুল (সা.) ফিরে আসেন, তখন তাঁর অজুর পানি তখনও গড়াচ্ছিল এবং বিছানা গরম ছিল। আধুনিক বিজ্ঞানের ‘Time Dilation’ বা সময়ের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মাধ্যমে আল্লাহর অসীম কুদরতের এই বিষয়টি উপলব্ধি করা সহজ হয়।

মেরাজ আমাদের যা শেখায়:

  • বিপদে ধৈর্য ধারণ করলে আল্লাহর বিশেষ সাহায্য আসে।

  • নামাজ হলো আল্লাহর সাথে সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যম।

  • মানুষের অধিকার (হককুল ইবাদ) নষ্ট করা বা গিবত করা ভয়াবহ অপরাধ।

  • বিশ্বাসীদের জন্য অদৃশ্য জগতের ওপর বিশ্বাস রাখা ইমানের অঙ্গ।

ইসরা ও মেরাজ কেবল একটি অলৌকিক ঘটনাই নয়, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যে এক সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী রেখা। এই ঘটনার পর আবু বকর (রা.) কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই তা বিশ্বাস করে ‘সিদ্দিক’ উপাধি লাভ করেন। মেরাজের শিক্ষা আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করাই হোক এই মহিমান্বিত রজনীর প্রকৃত সার্থকতা।