bogra times Add
ঢাকাবুধবার , ১১ মার্চ ২০২৬

হাইব্রিডের কাছে হার মানছে বগুড়ার দেশি মরিচ, ৫ বছরে অর্ধেক কমেছে চাষ

বগুড়া প্রতিনিধিঃ-
মার্চ ১১, ২০২৬ ২:৩১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বগুড়া প্রতিনিধিঃ মার্চের মধ্যভাগে সারিয়াকান্দির কালিতলা গ্রোয়েন বাঁধের বিশাল চর এবার অনেকটা ফাঁকা। কয়েক বছর আগেও এই সময়টায় বাঁধের ওপর রোদে শুকাতে দেওয়া লাল মরিচের সমারোহ চোখ ঝলসে দিত। কিন্তু এবার দৃশ্য পাল্টেছে। বাঁধের অর্ধেক অংশেও মরিচ বিছানো হয়নি।

এখানকার মরিচ ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম আক্ষেপের সুরে বলছিলেন, ‘বাঁধের অর্ধেকও মরিচ বিছানো হয়নি। একসময় এখানে পা ফেলার জায়গা থাকত না, এখন সুনসান নীরবতা।’

সাইফুলদের এই আক্ষেপের পেছনে শুধু একটি মৌসুমের গল্প নয়, বরং বিগত পাঁচ বছরের একটি বড় বদলের চিত্র উঠে এসেছে কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যানে। গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে বগুড়ায় মরিচ চাষের জমি কমেছে প্রায় এক হাজার হেক্টর। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার ঐতিহ্যবাহী বগুড়ার দেশি মরিচ।

হালকা ঝালের স্বাদ, সুন্দর ঘ্রাণ ও উজ্জ্বল রঙের কারণে বগুড়ার দেশি মরিচের সুনাম সারা দেশে। বিশেষ করে সারিয়াকান্দির যমুনা পাড়ের এই মরিচ শুকনো মরিচের গুঁড়ো হিসেবেও প্রথম সারিতে বিবেচিত। হাইব্রিড মরিচের বীজ পরের বছর কাজে না লাগলেও দেশি মরিচের বীজ সংরক্ষণ করে আবার ব্যবহার করা যায়— এটি ছিল কৃষকের জন্য বাড়তি সুবিধা। কিন্তু সেই সুবিধাও এখন আর টিকিয়ে রাখতে পারছেন না চাষিরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত পাঁচ অর্থবছরে ধীরে ধীরে মরিচ চাষের জমি ও উৎপাদন দুটোই কমেছে। চলতি অর্থবছরে জেলায় মরিচের আবাদ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪০০ হেক্টরে। এর মধ্যে দেশি জাতের আবাদ মাত্র ১ হাজার ৭৩০ হেক্টর। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে দেশি মরিচের চাষ ছিল ২ হাজার ১০০ হেক্টর, সেখানে পাঁচ বছরের ব্যবধানে তা নেমে এসেছে ১ হাজার ৭৩০ হেক্টরে। এখন পর্যন্ত ৫০ শতাংশ জমির ফলন উত্তোলন করা হয়েছে—তা-ও কাঁচা মরিচ হিসেবে।

বগুড়ায় সবচেয়ে বেশি মরিচ উৎপাদন হয় সারিয়াকান্দি উপজেলায়। চলতি বছর মোট আবাদের প্রায় অর্ধেক—অন্তত ২ হাজার ৬০০ হেক্টর জমি এই একটি উপজেলায়। এরপরেই আছে যমুনা নদীঘেঁষা সোনাতলা ও ধুনট উপজেলা।

সারিয়াকান্দির বাটির চরের কৃষক শামিম আহমেদ আগে অন্তত আট বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করতেন। নদীভাঙনে জমি বিলীন হওয়ায় এখন তা নেমে এসেছে চার বিঘায়। এ বছর এসব জমির মাত্র ৪০ শতাংশে তিনি চাষ করেছেন বগুড়ার দেশি মরিচ। বাকি সব হাইব্রিড। অথচ আগে তিনি মোট জমির অর্ধেকেই দেশি মরিচ চাষ করতেন।

কেন এই বদল? আবুল হাসেন বলেন, ‘একই জমি থেকে হাইব্রিড মরিচ সাত-আট বার তোলা যায়। যেখানে দেশি মরিচ তোলা যায় মাত্র দু-এক বার। বাজারে কাঁচা মরিচের দাম ভালো। একই খরচে হাইব্রিডে লাভ বেশি।’

কালিতলা ঘাটে মরিচ শুকানোর কাজে ব্যস্ত থাকা স্বপ্না খাতুন বলেন, ‘বগুড়ার দেশি মরিচের স্বাদ, গন্ধই আলাদা। কিন্তু দেশি আর হাইব্রিড মরিচের খরচ তো একই। বরং দেশি মরিচ শুকানোর ঝামেলা বেশি। তাই মানুষ এখন কাঁচা থাকতেই বাজারে বিক্রি করে দেয়।’

চর বাদিয়ার গ্রামের কৃষক ফারুক হিসাবটা স্পষ্ট করলেন, ‘আমরা এখনই কাঁচা মরিচের দাম পাচ্ছি চার-ছয় হাজার টাকা মণ। সেখানে মরিচ শুকিয়ে প্রতি মণে দাম পাওয়া যায় ১১-১২ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিলে লাভ তো আর থাকে না। আর কিছুদিন পর শুকনো মরিচের চাহিদাই যদি না থাকে, তাহলে কে আর দেশি মরিচ করবে?’

অনেক কৃষক সরাসরি মরিচ চাষ ছেড়েই দিচ্ছেন। ধুনটের বেড়ের বাড়ি এলাকার কৃষক আনিছুর এবার দুই বিঘা জমিতে মরিচের বদলে ভুট্টা চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ভুট্টা চাষে খরচ কম, সময়ও তেমন দিতে হয় না। দামও ভালো পাওয়া যায়। নিচু জমিতে পানি থাকায় ভুট্টাই ভালো হলো।’

শুধু অর্থনৈতিক কারণ নয়, প্রকৃতিও সহায়তা করছে না। জেলার কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, তাপমাত্রা ৩৩ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে মরিচের ফুলের পরাগায়ন ব্যাহত হয়। গত কয়েক বছর তাপমাত্রা বেশি থাকায় ফলন কমেছে। আবার গত বছর বৃষ্টির পরিমাণ ছিল বেশি, ফলে মরিচের খেত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় অনেক কৃষকই চাষ করেননি।

কৃষি বিভাগ বলছে, বগুড়ায় হেক্টর প্রতি দেশি জাতের কাঁচা মরিচের গড় উৎপাদন ১৪ টন। আর হাইব্রিড মরিচের গড় উৎপাদন ১৬ টন। মরিচ শুকালে এর গড় উৎপাদন হয় ২ দশমিক ৮৫ টন।

বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দিন ফিরোজ বলেন, ‘কৃষক যেখানে লাভ পাবেন, সেটাই বেশি চাষ করবেন—এটাই স্বাভাবিক। তবে মরিচের ফলন বৃদ্ধির জন্য আমাদের গবেষকরা বেশ কিছু ভালো জাত উদ্ভাবন করেছেন। আমরা সেগুলো চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। দেশি মরিচের জাত সংরক্ষণেও আমরা কাজ করছি।’

একসময়ের ঐতিহ্যবাহী বগুড়ার দেশি মরিচ এখন শুধু স্মৃতিতে পরিণত হওয়ার পথে। লাভের হিসাব আর বাজারের চাহিদার টানাপোড়েনে হারিয়ে যাচ্ছে এই স্থানীয় জাত। কৃষি বিভাগের উদ্যোগ আর কৃষকদের সচেতনতা না বাড়লে হয়তো আগামী দিনে বগুড়ার দেশি মরিচের নাম শুধু ইতিহাসের পাতাতেই খুঁজে পাওয়া যাবে।