bogra times Add
ঢাকাশনিবার , ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আলু চাষিরা ফের লোকসানে, বিঘায় ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা

আলিফ হোসেনঃ-
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬ ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি:

রাজশাহীর তানোর উপজেলায় আগাম জাতের আলু চাষিরা ফের লোকসানের মুখে পড়েছেন। এবার ফলন তুলনামূলক ভালো হলেও বাজারে দাম না পাওয়ায় হতাশা নেমে এসেছে কৃষকের মাঝে। উপরন্তু ‘ঢলন প্রথা’র নামে প্রতি মণ আলু বিক্রিতে অতিরিক্ত ৫ কেজি আলু দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা, যা ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সম্প্রতি তানোর পৌরসভার গোকুল মোড় এলাকায় ট্রাকে আলু লোড করতে দেখা গেছে কয়েকজন শ্রমিককে। পাশেই মলিন মুখে বসে ছিলেন আলু চাষি ফিরোজ। তিনি জানান, আগাম জাতের আলু চাষ করে এবার খরচের অর্ধেক টাকাও তুলতে পারছেন না চাষিরা। গত মৌসুমেও একইভাবে লোকসান গুনতে হয়েছে। এবার ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় বিলপাড়ের উঁচু জমিতে পুনরায় আগাম জাতের আলু চাষ করে ধরাশায়ী হয়েছেন তিনি।

লোকসানের হিসাব

ফিরোজ জানান, তিনি এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। ফলন তুলনামূলক ভালো হয়েছে। বিঘায় ফলন হয়েছে প্রায় ৫০ বস্তা (প্রতি বস্তায় ৭০ কেজি)। কিন্তু বাজারে নতুন আলুর দাম কম। প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। আলু বিক্রি করা হয়েছে সাড়ে ৯ টাকা কেজি দরে। তবে এক বস্তায় ৭০ কেজি আলু নিলেও ব্যবসায়ীরা দাম দিচ্ছেন মাত্র ৬৫ কেজির। সব মিলিয়ে বিঘায় আসছে ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা। এতে বিঘায় ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

আলু চাষি রইচ উদ্দিন জানান, তিনি সাড়ে তিন বিঘা জমির আলু উত্তোলন করে সাড়ে ৯ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন। আরেক কৃষক জানান, তিনি আড়াই বিঘা জমির আলু একই দামে বিক্রি করেছেন। তারা জানান, বিঘায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করে ফেরত পাচ্ছেন ২৬ থেকে ২৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ বিঘায় ২২ থেকে ২৪ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

তবে কৃষক মুনসুরের ভাষ্য, কিছু জমিতে খরচ ও লোকসানের হিসাব আরও ভয়াবহ। তিনি বলেন, “বিঘায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করে পাচ্ছি ২৬ থেকে ২৮ হাজার টাকা। বিঘায় ৩২ হাজার টাকা লোকসান হলে পথে বসা ছাড়া উপায় কী?”

ঢলন প্রথায় বাড়তি ক্ষতি

লোকসানের আরেক বড় কারণ ‘ঢলন প্রথা’। প্রতি বস্তা (৭০ কেজি) আলু কিনতে ব্যবসায়ীরা চাষিদের কাছ থেকে ৫ কেজি করে বাড়তি আলু নিচ্ছেন। অর্থাৎ ৭০ কেজির বস্তা লোড হলেও কৃষক পাচ্ছেন মাত্র ৬৫ কেজির দাম। প্রতি বস্তায় ৫ কেজি বাড়তি দিতে হচ্ছে, যার বাজারমূল্য ৪৭ টাকা ৫০ পয়সা (সাড়ে ৯ টাকা কেজি দরে)। সেই হিসেবে ঢলন বাবদ প্রতি বিঘায় চাষিদের বাড়তি দিতে হচ্ছে প্রায় ২৫০ কেজি আলু, যার মূল্য পড়ছে ২ হাজার ৩৭৫ টাকা।

চাষিদের অভিযোগ, ঢলন না দিলে ব্যবসায়ীরা আলু কিনছেন না। অথচ এই ঢলন নিয়েই ব্যবসায়ীদের লাভ, কারণ আলুর দাম কম থাকায় এটাই তাদের মূল মুনাফার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী আইনুল জানান, এসব আলু খুলনায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে কেজিতে এক থেকে দুই টাকা বাড়তি দাম পাওয়া যায়। ঢলনের বিষয়ে তিনি বলেন, জমি থেকে একেবারে কাঁচা আলু কেনা হচ্ছে। খুলনা মোকামে যেতে অনেক ওজন কমে যায়। আবার কয়েকদিন বিক্রি করতে না পারলে বেশি পরিমাণ ওজন কমে। এ কারণে ঢলন নিতে হয়।

অপর ব্যবসায়ী মাসুদ বলেন, গত বছরের মতো এবছরও আলুতে ধরাশায়ী চাষিরা। বিঘায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করে পাচ্ছে ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা। বিঘায় ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

মুনসুর নামের এক আলু চাষি জানান, তিনি রাব্বানী ২৫ কাঠা জমির আলু তুলে সাড়ে ৯ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন। গতবার তিনি ৮ বিঘা জমিতে আলু চাষ করে ধরা খেয়ে এবার চাষ কমিয়ে ৪ বিঘা জমিতে নামিয়েছেন।

উৎপাদন খরচ ও ফলনের হিসাব

চাষিরা জানান, পুরোদমে আলু তোলা শুরু হয়নি। যারা আগাম আলু রোপণ করেছিলেন তাদের আলু উঠতে শুরু করেছে। এবার জমি লিজ ও বীজ আলু কিছুটা কম দামে পাওয়া গেলেও সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত দামের কারণে উৎপাদন খরচ অনেকটাই বেড়েছে।

তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, এ বছর উপজেলায় ১২ হাজার ১৯০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৫০ হেক্টর জমির আলু তোলা হয়েছে। হেক্টর প্রতি ফলন হয়েছে প্রায় ২৫ মেট্রিক টন। দাম কমে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি জানান, কৃষি বিভাগের কাজ হচ্ছে চাষাবাদে রোগবালাই দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দাম নির্ধারণের বিষয়টি কৃষি বিপণন বিভাগের কাজ।

এ বিষয়ে কৃষি বিপণন রাজশাহী বিভাগের উপপরিচালক (উপসচিব) শাহানা আখতার জাহানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।