bogra times
ঢাকাবুধবার , ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সরিষা ক্ষেতে মৌমাছির গুঞ্জন, ভ্রাম্যমাণ তিন মৌ চাষির সাফল্যের গল্প

এনাম হকঃ-
ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬ ৯:৩৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

এনাম হক, বগুড়া থেকেঃ

বিস্তীর্ণ সরিষা ক্ষেতের হলুদ ফুলের ভেতর শোনা যায় মৌমাছির অবিরাম গুঞ্জন। সেই গুঞ্জনই এখন জীবিকার নতুন সম্ভাবনা হয়ে উঠেছে তিন তরুণের কাছে। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার চান্দাইকোনা বগুড়া বাজার ও পাবনা বাজার এলাকার সরিষা ক্ষেতের পাশে ভ্রাম্যমাণ মধু খামার গড়ে তুলে সাফল্যের মুখ দেখেছেন তারা।

খামারটিতে সারি সারি করে রাখা হয়েছে ১৭০টি মৌমাছির বাক্স। প্রতিটি বাক্সে একটি করে রানী মৌমাছি থাকে। তার নেতৃত্বেই হাজারো কর্মী মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। প্রতিদিন সকাল ৯টায় বাক্স খুলে দেওয়া হলে মৌমাছিগুলো সরিষা ফুলে ছড়িয়ে পড়ে। সারাদিন মধু সংগ্রহ শেষে সন্ধ্যা নামলে তারা আবার নিজ নিজ বাক্সে ফিরে আসে। সাত দিন পর পর প্রতিটি বাক্স থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। একটি বাক্স থেকে সপ্তাহে গড়ে দুই থেকে তিন কেজি মধু পাওয়া যায়।

সংগৃহীত মধু বিশেষ ড্রামে ঢেলে প্রক্রিয়াজাত করে বোতলজাত করা হয়। বর্তমানে প্রতি কেজি মধু বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকায়। এই খামার থেকে উৎপাদিত মধু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে।

খামারের সঙ্গে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে যুক্ত মো. রিপন বলেন, মৌচাষ পুরোপুরি ফুল ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। আবহাওয়া ভালো থাকলে ফুল বেশি হয় এবং মধু উৎপাদনও বাড়ে। তবে চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় ফুল কম হয়েছে। ফলে উৎপাদনে কিছুটা তারতম্য দেখা দিয়েছে। বছরে ছয় মাস মৌচাষের মৌসুম থাকে। বাকি সময় মৌমাছিগুলোকে বাড়িতে রেখে চিনি ও পানি মিশিয়ে খাওয়ানো হয়।

খামারের সঙ্গী রাকিব জানান, প্রতি মাসে গড়ে এক হাজার ২০০ কেজি মধু সংগ্রহ করা হয়। ছয় মাসে মোট প্রায় সাত হাজার ২০০ কেজি মধু বিক্রি করে আয় হয়েছে আনুমানিক ৫০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টাকা লাভ থাকে। তিনজন মিলে খামারের কাজ পরিচালনা করেন এবং মাসে শ্রম খরচ হয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা। লাভজনক হওয়ায় পড়ালেখা ছেড়ে তারা পুরোপুরি মৌচাষে মনোযোগী হয়েছেন।

মৌচাষের মৌসুমে তারা দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে মধু সংগ্রহ করেন। প্রথম মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের মুকুল থেকে মধু সংগ্রহ শুরু হয়। এরপর নওগাঁ ও সিরাজগঞ্জের সরিষা, দিনাজপুরের লিচু এবং পরে বরিশাল, শরীয়তপুর, ফরিদপুর ও মাদারীপুরের জিরা, ধনিয়া ও কালোজিরা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। ভুট্টা ক্ষেত থেকেও মৌমাছি কিছু খাদ্য পায়, যদিও সেখান থেকে মধু তুলনামূলক কম হয়।

খামারের কর্তা মঞ্জিল বলেন, বর্তমানে তাদের খামারে ১৭০টি বাক্স রয়েছে। আগামী বছর তা বাড়িয়ে ৩০০টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বছরে ১৭০টি বাক্স থেকে গড়ে ২০ থেকে ৩০ মণ মধু পাওয়া যায়। এ বছর সরিষার ফুল কম হওয়ায় মধুর দাম তুলনামূলক বেশি রয়েছে।

শেরপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দার জানান, উপজেলায় তেল জাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মৌচাষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় সরিষা ২ হাজার ১৮০ হেক্টর, সূর্যমুখী ০.৫ হেক্টর, পেঁয়াজ ১০৫ হেক্টর, আম ১২৫ হেক্টর এবং লিচু ৫৬ হেক্টর জমিতে মৌ বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। এসব এলাকায় ৩০টি মৌ বাক্স ও ৯টি উদ্বুদ্ধকরণ বাক্স থেকে মোট ২২০ কেজি মধু উৎপাদন হয়েছে, যার বিক্রয়মূল্য প্রতি কেজি ৬০০ টাকা।

তিনি বলেন, মৌচাষ শুধু মধু উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের ফলন বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পেলে এ খাত আরও বিস্তৃত হয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।