bogra times Add
ঢাকাসোমবার , ৯ মার্চ ২০২৬

জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা: কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়ার সম্ভাবনা

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ-
মার্চ ৯, ২০২৬ ৪:১৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় আজ জরুরি বৈঠকে বসছেন জি৭ দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) সমন্বয়ে কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) থেকে জ্বালানি তেল ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়েই মূলত এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে, নিউইয়র্ক সময় সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে) এই ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হবে। এতে জি৭-এর অর্থমন্ত্রীদের সঙ্গে আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফতিহ বিরল অংশ নেবেন।

সূত্রগুলোর মতে, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রসহ জি৭-এর অন্তত তিনটি দেশ এসপিআর থেকে জ্বালানি তেল ছাড়ার ধারণাকে সমর্থন জানিয়েছে।

কেন জরুরি এই বৈঠক?

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। গত এক সপ্তাহে এই দাম বৃদ্ধির ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ বেন্ট ক্রুড আজ এশিয়ার লেনদেনে ২৪ শতাংশ লাফিয়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ৭১ সেন্টে পৌঁছায়। তবে জি৭ বৈঠকের খবর প্রকাশের পর দাম কিছুটা কমে প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে ১১০ ডলার ৮৫ সেন্টে নেমে আসে। অন্যদিকে মার্কিন মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) প্রথমে ২৮ শতাংশ বেড়ে ১১৬ ডলার ৪৫ সেন্ট হয়, পরে কমে প্রায় ১০৮ ডলারে নেমে আসে, যা এখনো প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি।

কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়ার সম্ভাবনা

আইইএর ৩২ সদস্য দেশ যৌথ জরুরি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এসপিআর ধরে রাখে। মূলত জ্বালানি তেলের দামের সংকট মোকাবিলায় ১৯৭৪ সালে আইইএ গঠনের সময় এই উদ্যোগ চালু হয়। এর পেছনে ছিল যুদ্ধে ইসরায়েলকে সমর্থন করায় ‘১৯৭৩ আরব ওয়েল এমবার্গো’র অভিজ্ঞতা, যখন জ্বালানি তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায় এবং পশ্চিমা বিশ্বে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট দেখা দেয়।

কিছু মার্কিন কর্মকর্তার ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় যৌথভাবে প্রায় ৩০-৪০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল ছাড় যথাযথ হতে পারে, যা মোট ১২৪ কোটি ব্যারেল মজুদের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ।

আইইএ প্রতিষ্ঠার পর থেকে সদস্য দেশগুলো যৌথভাবে পাঁচবার কৌশলগত মজুদ থেকে জ্বালানি তেল ছেড়েছে। সর্বশেষ দুইবার ছিল ২০২২ সালে, যখন ইউক্রেনে রুশ হামলার পর জ্বালানির দাম বেড়ে গিয়েছিল।

মজুদের পরিমাণ কত?

গত মঙ্গলবার আইইএর জরুরি বৈঠকের জন্য প্রস্তুত করা একটি নথিতে বলা হয়েছে, আইইএ ‘জ্বালানি তেল বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত’।

গোপন নথিটিতে উল্লেখ করা হয়:

  • আইইএ দেশগুলোর সরকারি মজুদ ১২৪ কোটি ব্যারেলের বেশি

  • শিল্প খাতে আরো প্রায় ৬০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে, যা প্রয়োজন হলে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে ব্যবহার করা যেতে পারে

  • এই মজুদ আইইএ দেশগুলোর মোট চাহিদার প্রায় এক মাসের সমান এবং নিট আমদানির হিসেবে ১৪০ দিনেরও বেশি সরবরাহ দিতে পারে

  • এ মজুদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের অংশ প্রায় ৭০ কোটি ব্যারেল বা অর্ধেকের বেশি

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রভাব

জ্বালানি তেলের দামের এই উল্লম্ফন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল্যস্ফীতি কমানো এবং জ্বালানি খরচ হ্রাসের প্রতিশ্রুতিকে দুর্বল করে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে গড় পেট্রলের দাম গতকাল গ্যালন প্রতি ২ ডলার ৯৮ সেন্ট থেকে বেড়ে ৩ ডলার ৪৫ সেন্টে পৌঁছেছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে দাম আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যে কিছু রিপাবলিকান সমালোচনা করেছেন যে, দেশীয় জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর চেয়ে পররাষ্ট্রনীতিতে বেশি সময় দিচ্ছেন ট্রাম্প।

গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প জ্বালানি তেলের দাম বাড়া নিয়ে উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়ে লেখেন, ‘ইরানের পারমাণবিক হুমকি ধ্বংস হলে স্বল্পমেয়াদি জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত কমে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য এটি খুবই সামান্য মূল্য। শুধু বোকা লোকেরাই ভিন্নভাবে ভাববে!’

বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব

বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিকারকদের মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, জার্মানি, ইতালি ও স্পেন। ফলে দামের ধাক্কায় এসব দেশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রতিক্রিয়ায় আজ এশিয়ার অনেক দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা যায়। ফিউচার সূচকের ইঙ্গিত অনুযায়ী, মার্কিন শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের পতনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা আর্থিক বাজারে চাপ আরো বাড়াতে পারে।

কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি শুক্রবার সতর্ক করে বলেন, চলমান যুদ্ধ ‘বিশ্ব অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে’ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রফতানিকারকরা কয়েক দিনের মধ্যেই উত্তোলন বন্ধ করে দিতে পারে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন আইইএর পূর্ণ সদস্য নয়। কিন্তু দেশটিরও বিপুল জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে, যা গত ১২ মাসে গড়ে তোলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের অনুমান অনুযায়ী, বেইজিংয়ের কাছে ১১০-১৪০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল থাকতে পারে, যা দেশটির আমদানির চাহিদা প্রায় ১৪০ দিন পর্যন্ত পূরণ করতে সক্ষম।