bogra times cover image-1
ঢাকাFriday , 30 October 2026

২০ হাজার টাকা সম্বল, পায়ে হেঁটে মক্কার পথে ৬০ বছরের আব্দুর রহিম

এনাম হকঃ-
October 30, 2026 11:27 pm
Link Copied!

এনামুল হক, শেরপুর (বগুড়া)।।

জীর্ণ কুঁড়েঘরে বসবাস, পেশায় কৃষিশ্রমিক; স্ত্রী কাজ করেন হোটেলে। অভাবের সংসারে সঞ্চয় বলতে মাত্র ২০ হাজার টাকা। সেই অর্থ নিয়েই পবিত্র হজ পালনের স্বপ্নে বাড়ি ছেড়েছেন বগুড়ার আব্দুর রহিম। তবে মক্কায় পৌঁছানোর এই দীর্ঘ পথ কতটা সহজ, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

একটি জীর্ণ কুঁড়েঘর। টিনের ছাউনির ওপর বৃষ্টির পানি ঠেকাতে বিছানো পলিথিন। ঘরের ভেতর নিত্যদিনের অভাব-অনটনের সংসার। অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিকের কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়েই চলে সংসার। স্ত্রীও স্থানীয় একটি হোটেলে মসলা বাটার কাজ করেন। বয়স ৬০ বছর। জীবনের এই সময়ে এসে এমন একজন মানুষের স্বপ্ন শুনলে অনেকেই হয়তো বিস্মিত হবেন। তাঁর স্বপ্ন পায়ে হেঁটে পবিত্র মক্কায় গিয়ে হজ পালন করা।

এই স্বপ্ন পূরণের আশায় মাত্র ২০ হাজার টাকা সম্বল করে বাড়ি ছেড়েছেন আব্দুর রহিম। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের আমিনপুর আদর্শ গ্রামের বাড়ি থেকে মক্কার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন তিনি। তাঁর বাবার নাম মৃত ফয়েজ উদ্দিন।

শুক্রবার বিকেলে আব্দুর রহিমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বসতঘর বলতে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর। টিনের চালের বেশির ভাগ অংশ পলিথিন দিয়ে ঢাকা। এই ঘরেই স্ত্রী রহিতন বিবিকে নিয়ে বসবাস করেন তিনি। সংসারে সচ্ছলতা নেই, নেই সঞ্চিত অর্থ কিংবা জমিজমার উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পদ। অথচ এই সংসারের মানুষটির বুকেই বছরের পর বছর ধরে বাসা বেঁধেছে মক্কায় যাওয়ার স্বপ্ন।

রহিতন বিবি জানান, তাঁর স্বামী অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিকের কাজ করেন। কাজ থাকলে আয় হয়, না থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। সংসারের খরচ মেটাতে তিনিও স্থানীয় একটি হোটেলে মসলা বাটার কাজ করেন। তাঁদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।

স্বামীর হজে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে গিয়ে রহিতন বিবি জানান, প্রায় ছয় বছর আগে তাঁর স্বামী বরিশালের চরমোনাইয়ে ওরশ মাহফিলে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পর থেকেই তাঁর মনে হজ পালনের ইচ্ছা জাগে। এরপর থেকে সুযোগ পেলেই হজে যাওয়ার কথা বলতেন। কিন্তু অভাবের সংসারে এত টাকা জোগাড় করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

রহিতন বিবি বলেন, স্বামীর এই ইচ্ছায় কখনো বাধা দেননি। শুক্রবার সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে তাঁর জন্য দোয়া করছেন। আল্লাহ যেন তাঁর মনের আশা পূরণ করেন। তবে স্বামীর কাছে ঠিক কত টাকা রয়েছে, সেটিও তিনি জানেন না। এ কারণে তাঁর মনে উদ্বেগও রয়েছে।

লাকড়ি বিক্রি করে জমানো টাকাঃ

আব্দুর রহিমের হজে যাওয়ার স্বপ্ন শুধু মুখের কথা ছিল না। সেই স্বপ্ন পূরণে সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ জমানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। গ্রামের মানুষের ভাষ্য, কাজের ফাঁকে কিংবা অবসর সময়ে হজে যাওয়ার কথা স্মরণ করে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতেন রহিম। অর্থ সঞ্চয়ের জন্য কর্তন করা গাছের গোড়া ও মোথা সংগ্রহ করতেন। সেগুলো থেকে লাকড়ি তৈরি করে জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করতেন।

একই গ্রামের আনোয়ার হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম, শফিকুল ইসলাম ও সুলতান মাহমুদসহ অন্তত ১০ জন প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে আব্দুর রহিমের মধ্যে হজ পালনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল। এভাবে নানা কষ্টের মধ্যে তাঁর সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জমেছে।

প্রতিবেশীরা জানান, প্রায় দুই বছর আগে অনেক কষ্টে পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন আব্দুর রহিম। কিন্তু অর্থের অভাবে ভিসা সংগ্রহ করতে পারেননি। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত পায়ে হেঁটেই মক্কার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন তিনি।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর গলায় ঝোলানো ছিল একটি নেমপ্লেট। তাতে পায়ে হেঁটে পবিত্র হজ পালনে যাওয়ার কথা লেখা ছিল। হাতে ছিল বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। তাঁর এই যাত্রা দেখে গ্রামের মানুষ বিস্মিত হয়েছেন। কেউ তাঁর স্বপ্নের কথা শুনে আবেগাপ্লুত হয়েছেন, আবার কেউ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

স্বপ্নের পথে কঠিন বাস্তবতাঃ

বাংলাদেশ থেকে পায়ে হেঁটে সৌদি আরব পৌঁছানো সহজ কোনো বিষয় নয়। সম্ভাব্য স্থলপথে ভারত, পাকিস্তান ও ইরানের মতো দেশের সীমান্ত অতিক্রম করতে হতে পারে। প্রতিটি দেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা, বৈধ প্রবেশের অনুমতি এবং সীমান্ত পারাপারের নিয়ম মানতে হবে। শুধু পাসপোর্ট থাকলেই এসব দেশের সীমান্ত অতিক্রম করা সম্ভব নয়।

এর বাইরে রয়েছে সৌদি আরবে হজ পালনের আনুষ্ঠানিকতা। হজের জন্য নির্ধারিত ভিসা ও অনুমোদন প্রয়োজন। সাধারণ পর্যটক বা ভিজিট ভিসা নিয়ে হজ পালন করা যায় না। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে প্রয়োজন শারীরিক সক্ষমতা, চিকিৎসার প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত অর্থ ও নিরাপদ ভ্রমণব্যবস্থা।

আব্দুর রহিমের কাছে এসব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অনুমতি রয়েছে কি না, তা জানা যায়নি। মাত্র ২০ হাজার টাকা নিয়ে কীভাবে কয়েকটি দেশ পেরিয়ে সৌদি আরবে পৌঁছাবেন, সেটিও অনিশ্চিত। তাঁর বয়স ও আর্থিক অবস্থার কারণে যাত্রাপথে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

ভবানীপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. নাজির হোসেন বলেন, আব্দুর রহিম তাঁর কাছ থেকে একটি নাগরিকত্ব সনদ নিয়েছেন। তিনি শুনেছেন, আব্দুর রহিম পায়ে হেঁটে পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।

আব্দুর রহিমের স্বপ্নের কথা ছড়িয়ে পড়ায় গ্রামের মানুষের মধ্যে তাঁকে নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রতিবেশীদের প্রত্যাশা, কোনো সহৃদয় ব্যক্তি কিংবা সামর্থ্যবান প্রতিষ্ঠান তাঁর পাশে দাঁড়াবে। তবে আবেগের পাশাপাশি তাঁর নিরাপত্তা এবং বৈধভাবে গন্তব্যে পৌঁছানোর বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

একদিকে অভাবের সংসার, অন্যদিকে মক্কায় যাওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। জীবনের সঞ্চিত সামান্য অর্থ নিয়ে বাড়ি ছেড়েছেন ৬০ বছরের আব্দুর রহিম। তাঁর সামনে এখন দীর্ঘ পথ। সেই পথের শেষ প্রান্তে স্বপ্নের মক্কা, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর বাস্তব প্রস্তুতি ও সামর্থ্য কতটুকু, তার উত্তর এখনও অজানা।

error: Content is protected !!