bogra times cover image-1
ঢাকাবুধবার , ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সার্কাসের আলোয় জোকারের হাসি, তাঁবু গুটোলেই অনিশ্চিত জীবন

এনাম হকঃ-
সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬ ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

এনাম হক বগুড়া থেকেঃ

সার্কাসের মঞ্চে আলো জ্বলে উঠতেই বদলে যায় জোঁকার মো. রিপনের চেহারা। রঙিন পোশাক, মুখে নানা রঙের মেকআপ, নাকে নকল লাল নাক। কখনো অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাঁটেন, কখনো হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়ার অভিনয় করেন। তাঁর কোনো সংলাপ নেই। তবু দর্শকের হাসি থামে না।

বিশেষ করে শিশুরা মেতে ওঠে তাঁর কাণ্ড দেখে। কেউ হেসে ওঠে, কেউ হাততালি দেয়। কয়েক মিনিটের জন্য সার্কাসের তাঁবুর ভেতর তৈরি হয় আনন্দের এক আলাদা পরিবেশ।

এই আনন্দের কারিগর রিপনের বয়স এখন কত, তা হিসাবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাঁর সার্কাসজীবনের দীর্ঘতা। প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি এই পেশায়। নাটোরের বনলতা সেন এলাকার এই মানুষটির বেড়ে ওঠাও সার্কাসের সঙ্গে। বর্তমানে ১২০ বছরের বেশি সময় ধরে চলা ঢাকার নবাবগঞ্জের দ্য লায়ন সার্কাসের সঙ্গে তিনি ঘুরছেন দেশের বিভিন্ন মেলা ও অনুষ্ঠানে।

রিপনের ভাষা শব্দের নয়, শরীরের। পড়ে যাওয়া, অদ্ভুত হাঁটাচলা, নানা অঙ্গভঙ্গি, বল ও রিং নিয়ে জাগলিং কিংবা ভারসাম্যের খেলা দিয়ে দর্শকদের আনন্দ দেন। জোকারির পাশাপাশি হাই জাম্প, লং জাম্প, ডিগবাজি ও রডের খেলাও দেখাতে পারেন তিনি।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের কল্যাণী এলাকায় সার্কাসের তাঁবুতে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। সার্কাসের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে রিপন বলেন, ‘আমরা শিল্পীগোষ্ঠী এই জগতটা ধরে রাখতে চাই। জোকারি করতে ভালো লাগে। মানুষ হাসানো আমাদের দায়িত্ব। আমাদের অভিনয় দেখে দর্শক হাসে, এটা আমাদের ভালো লাগা।’

কথাগুলো বলার সময় তাঁর মুখে পেশার প্রতি তৃপ্তি থাকলেও বাস্তবতার কথা উঠতেই সেই স্বস্তি অনেকটা মিলিয়ে যায়।

কাজ কমেছে, কমেছে আয়ও

রিপনের সার্কাসজীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে কাজের ক্ষেত্রে। একসময় সার্কাসে ব্যস্ততা ছিল অনেক। ১০ থেকে ১৫ বছর আগেও নিয়মিত কাজ পেতেন। এখন সেই সুযোগ অনেক কমে গেছে।

মেলা আগের মতো জমে না। সার্কাস দেখতে মানুষের আগ্রহও কমেছে। ফলে কাজ কমেছে, কমেছে আয়ও।

রিপন বলেন, ‘১০-১৫ বছর আগে অনেক কাজ থাকত। এখন খেলা অনেক কমে গেছে। মেলা ভালো চলে না, সার্কাস মানুষ কম দেখে।’

কাজ থাকলে দিনে প্রায় এক হাজার টাকা সম্মানি পান তিনি। কিন্তু সার্কাসের কাজ নিয়মিত না থাকায় আয়ও নিয়মিত নয়।

‘সার্কাসের বাইরে ব্যক্তিগত জীবনে ভালো আছি। তবে খেলা না থাকলে খারাপ লাগে,’ বলেন রিপন।

একসময় ১০ মাস, এখন পাঁচ মাস

একই চিত্র রুহুল আমিনের জীবনেও। প্রায় ৩০ বছর ধরে সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত এই শিল্পীর কাছে সার্কাস শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, ভালোবাসার জায়গাও।

কিন্তু সেই ভালোবাসার জগৎ এখন আগের মতো নেই।

রুহুল আমিন বলেন, ‘আমরা মানুষকে আনন্দ দিই, নিজেরাও আনন্দ পাই। কিন্তু সার্কাসের আগের সেই জৌলুস আর নেই।’

একসময় বছরে প্রায় ১০ মাসই সার্কাস নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন তিনি। ১৫ বছর আগেও ছিল সেই ব্যস্ততা। এখন সার্কাসে কাজের সময় কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ মাসে।

বাকি সময় বাড়িতে বসে থাকতে হয়। সংসার চালাতে ছোটখাটো কাজ খুঁজতে হয়। কোনো কাজ পেলে সেটিই করেন।

এই শিল্পীর কাছে সার্কাসের সংকট শুধু দর্শক কমে যাওয়ার বিষয় নয়। মেলা ও সার্কাসের অনুমতি পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা জটিলতার কথা জানান তিনি।

রুহুল আমিনের ভাষায়, ‘মেলার অনুমতি পেলে সার্কাসের অনুমতি পাওয়া যায় না। আবার সার্কাসের অনুমতি পেলে মেলার অনুমতি মেলে না। এভাবেই চলছে।’

হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো সেই সার্কাস

একসময় সার্কাস ছিল গ্রামবাংলার অন্যতম বড় বিনোদন। কোনো এলাকায় সার্কাসের তাঁবু পড়লেই মানুষের মধ্যে তৈরি হতো কৌতূহল। শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও ভিড় করতেন।

দাঁতের খেলা, ভার উত্তোলন, রশির ওপর হাঁটা, ট্র্যাপিজ, ঝুলন্ত খেলা, জাগলিং, জোকারের কৌতুক, জাদুকরের ভেলকি, চাকা ও রিংয়ের খেলা কিংবা মোটরসাইকেলের ‘গ্লোব অব ডেথ’ ছিল দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

সময় বদলেছে। মানুষের বিনোদনের ধরনও বদলেছে। মুঠোফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নানা ধরনের ডিজিটাল বিনোদনের কারণে সার্কাসের প্রতি আগ্রহ কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে সার্কাসশিল্পীদের জীবনেও।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও কিছু পরিবর্তন। একসময় সার্কাসের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বন্য পশুপাখির খেলা। আইনি জটিলতার কারণে এখন সেই খেলা নেই। ফলে পুরোনো সার্কাসের পরিচিত একটি দৃশ্যও হারিয়ে গেছে।

রুহুল আমিন বলেন, ‘আগের মতো আনন্দ নেই। সার্কাসের বিনোদন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। এই শিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।’

সার্কাসের আলোয় জোকারের হাসি, তাঁবু গুটোলেই অনিশ্চিত জীবন

হাসির পেছনে দীর্ঘশ্বাস

সার্কাসের তাঁবুর ভেতরে দর্শকেরা যখন হাসেন, তখন রিপন কিংবা রুহুল আমিন তাঁদের নিজের চিন্তা ভুলে যান। দর্শকের আনন্দই তখন তাঁদের আনন্দ।

কিন্তু খেলা শেষ হওয়ার পর বাস্তবতা ফিরে আসে।

আলো নিভে যায়। দর্শকেরা বাড়ি ফেরেন। সার্কাসের শিল্পীরা ভাবতে থাকেন, পরের মেলায় কাজ থাকবে কি না, কত দিন খেলা চলবে, আয় দিয়ে সংসার চলবে কি না।

রুহুল আমিনের কথায়, ‘এখন মঞ্চে মানুষ হাসালেও দিন শেষে নীরব কান্না চলে আসে।’

এই নীরব কান্নার গল্প শুধু দুই জোকারের নয়। তাঁদের মতো আরও অনেক শিল্পীর জীবন জড়িয়ে আছে সার্কাসের সঙ্গে। কেউ কয়েক দশক ধরে এই পেশায় আছেন, কেউ আবার ছোটবেলা থেকেই সার্কাসের তাঁবুকে নিজের ঘর মনে করে এসেছেন।

তাঁদের কাছে সার্কাস কেবল একটি খেলা নয়। এটি তাঁদের পরিচয়, জীবিকা এবং ভালোবাসা।

তাই মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন জোকার পড়ে যাওয়ার অভিনয় করেন, দর্শকেরা হাসেন। যখন তিনি অদ্ভুতভাবে হাঁটেন, শিশুরা হাততালি দেয়। কিন্তু সেই রঙিন পোশাক খুলে ফেললে সামনে আসে অন্য এক মানুষ, যাঁর জীবনের রং অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।

সার্কাসের তাঁবুতে এখনো হাসির শব্দ শোনা যায়। তবে সেই হাসি ধরে রাখার মানুষগুলোর জীবনেই ক্রমেই বাড়ছে অনিশ্চয়তা। মঞ্চের আলো যতক্ষণ জ্বলে, তাঁরা মানুষকে হাসান। আলো নিভে গেলে শুরু হয় তাঁদের নিজেদের জীবনের হিসাব।