bogra times Add
ঢাকাশনিবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

গণভোটে হ্যাঁ : সংবিধানে কী কী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে?

নিউজ ডেস্কঃ-
ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬ ৯:১৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটের ফলাফল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত গেজেটে এই ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর আওতায় প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে।

একনজরে গণভোটের ফলাফল

  • মোট ভোটার: ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন

  • ভোট প্রদানের হার: ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ

  • ‘হ্যাঁ’ ভোট (পরিবর্তনের পক্ষে): ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি

  • ‘না’ ভোট (পরিবর্তনের বিপক্ষে): ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি

সংবিধানে কী কী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে

গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর জয়ের মাধ্যমে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ অন্তর্ভুক্ত ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হলো। ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় আসছে আমূল পরিবর্তন। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পরিবর্তন হলো:

১. ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা:
নতুন সংস্কারে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা কমিয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এখন থেকে নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হবে, ফলে ব্যক্তি বা দলের ইচ্ছার চেয়ে প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পাবে।

২. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ (দোতলা বাড়ির মতো):
সংসদ দুটি কক্ষে বিভক্ত হবে।

  • নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ): সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা থাকবেন, যা বর্তমান সংসদের মতোই কাজ করবে।

  • উচ্চকক্ষ (সিনেট): দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী, শিল্পী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত হবে। যেকোনো আইন পাসের আগে উচ্চকক্ষে যাচাই-বাছাই হবে, যা তাড়াহুড়ো করে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ রোধ করবে। ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশেও এই ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, যেখানে উচ্চকক্ষ ফেডারেল ইউনিট ও বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিত্ব করে।

৩. স্বাধীন সংসদ সদস্য: ‘৭০ অনুচ্ছেদ’ সংশোধন:
সংবিধানের বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন বা শিথিল করা হচ্ছে। এই অনুচ্ছেদের কারণে আগে কোনো সংসদ সদস্য (এমপি) দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে পারতেন না। নতুন ব্যবস্থায় এমপিরা সংসদে দলের হুইপের বাইরে গিয়ে নিজ নির্বাচনী এলাকার মানুষের চাহিদা ও বিবেকের আলোকে স্বাধীনভাবে মতামত দিতে ও ভোট দিতে পারবেন।

৪. সাংবিধানিক পদে নিয়োগে স্বচ্ছতা:
নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা অন্যান্য সাংবিধানিক পদে নিয়োগের জন্য একটি নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি বা সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। এর মাধ্যমে সরকারের একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সর্বসম্মতিক্রমে যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের পদে নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।

৫. মৌলিক অধিকার সুরক্ষা:
বাকস্বাধীনতা, তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের অধিকার সংবিধানে আরও দৃঢ়ভাবে সুরক্ষিত হবে। কোনো সরকার যেন হুট করে আইন করে এসব অধিকার খর্ব করতে না পারে, সে ব্যাপারে সাংবিধানিক বাধা তৈরি করা হবে।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ: একটি তুলনামূলক চিত্র

প্রস্তাবিত এই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা বিশ্বের বিভিন্ন গণতন্ত্রে বিদ্যমান। এর একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো:

বৈশিষ্ট্য ভারত (লোকসভা ও রাজ্যসভা) পাকিস্তান (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ও সিনেট)
নিম্নকক্ষ লোকসভা: জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত (৫৪৩ জন)। সরকার গঠন করে। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি: জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত। সরকার গঠন করে।
উচ্চকক্ষ রাজ্যসভা: রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের ভোটে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত। রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। স্থায়ী কক্ষ (কখনও বিলুপ্ত হয় না)। সিনেট: প্রদেশগুলো থেকে সমান সংখ্যক সদস্য পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। ছোট প্রদেশগুলোর অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
ক্ষমতার ভারসাম্য সাধারণ আইনে উভয় কক্ষের সম্মতি প্রয়োজন। অর্থবিল নিয়ে লোকসভা সর্বময় ক্ষমতা রাখে। মতানৈক্যে যৌথ অধিবেশনে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। ফেডারেল ইউনিটের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সিনেট গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিল পাসে উভয় কক্ষের সম্মতি লাগে।

প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার করে। প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন করে, যার ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব এই গণভোটে অনুমোদিত হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের বিপুল জয় এবং গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তনই নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধতিগত পরিবর্তন ও স্বৈরাচারমুক্ত শাসনব্যবস্থা কায়েমের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এই রায় একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করবে বলে মনে করছেন তারা।