bogra times Add
ঢাকাশনিবার , ১১ এপ্রিল ২০২৬

বস্তার দাম দ্বিগুণের বেশি, আলু চাষিদের দুশ্চিন্তা

কংকনা রায়, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
এপ্রিল ১১, ২০২৬ ১০:০৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে আলুর বস্তার দাম গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। চরম আকার ধারণ করেছে বস্তাসংকট। এর প্রভাব পড়েছে আলুর দামেও। বস্তার দাম বেশি হওয়ায় গত দুই দিনে কেজিতে আলুর দাম কমেছে ২ থেকে ৩ টাকা। চাষিরা বাড়ির পাশে আলু স্তূপ করে রাখছেন, কিন্তু ক্রেতা মিলছে না।

উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের পাঠকপাড়া গ্রামের আলুচাষি জাহাঙ্গীর আলম এবার পৌনে চার বিঘা জমিতে ক্যারেজ জাতের আলু চাষ করেছিলেন। ফলন ভালো হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এক ব্যবসায়ী ১৫ টাকা কেজি দরে আলু কিনতে আগ্রহ দেখান। শুক্রবার তাঁর আলু নেওয়ার কথা থাকলেও ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বস্তা সংকটের কারণে আলু নিতে আসতে পারছেন না। জাহাঙ্গীর আলম এখন নিজ বাড়িতেই কষ্ট করে আলু রাখছেন।

সরেজমিনে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ক্যারেজ জাতের আলু প্রতিকেজি ১৫ থেকে ১৬ টাকায় বিক্রি হলেও শনিবার (৪ এপ্রিল) সেই আলুর দাম নেমে আসে ১২ থেকে ১৩ টাকায়। দাম কমার পরও ক্রেতার দেখা মিলছে না। বস্তার অভাবে অনেক চাষি তাদের উৎপাদিত আলু হিমাগারেও রাখতে পারছেন না।

চাষি ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ

চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছর যে বস্তার দাম ছিল ৭৫ থেকে ৮০ টাকা, এবার সেই বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকায়। এ নিয়ে তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, পাটের দাম বৃদ্ধি ও কিছু হিমাগার কর্তৃপক্ষ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বস্তার দাম বাড়াচ্ছেন।

উপজেলার রাজারামপুর গ্রামের আলুচাষি ও ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান বলেন, ‘গত বছর ৭৫ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে বস্তা পাওয়া গেছে। এ বছর মৌসুমের শুরু থেকে ১২০ টাকা করে বস্তা কিনতে হয়েছে। ঈদের এক দিন পর ১৬০ টাকা করে বস্তা কিনেছি। এখন দাম উঠেছে ১৮০ টাকা। বস্তার অভাবে আলু কিনতে পারছি না।’

মেলাবাড়ী এলাকার আলুচাষি আল আমিন বলেন, ‘বস্তার অভাবে নিজের উৎপাদিত আলুর মাত্র ৬ বস্তা ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করতে পেরেছি। বাড়তি আলু বিক্রির অভাবে পড়ে আছে।’

রাজারামপুর মৎস্যপাড়া গ্রামের আলুচাষি মো. মামুন বলেন, ‘২২৫ বস্তা আলু হয়েছে। তার মধ্যে মাত্র ৩১ বস্তা ইতিমধ্যে হিমাগারে রেখেছি। বাকি ১৯৪ বস্তার জন্য বস্তা খুঁজে পাচ্ছি না। গত বছর যে বস্তার দাম সর্বোচ্চ ৮০ টাকা ছিল, এবার ১৮০ টাকা। বস্তার সংকটে আলুর দামও পড়ে গেছে।’

বায়না দিয়ে টাকা ফেরত নিতে চান না ব্যবসায়ী

বারাইহাট এলাকার আলুচাষি কার্তিক চন্দ্র রায় ৩ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। তাঁর ১৫০ বস্তা আলু হয়েছে। বুধবার (১ এপ্রিল) তিনি ১৬ টাকা কেজি দরে আলুর দাম মিটিয়ে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীকে ৫ হাজার টাকা অগ্রিম বায়না দিয়েছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) সেই ব্যবসায়ী তাঁকে জানান, আলুর দাম ১৩ টাকার বেশি দিতে পারবেন না। শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ী বলে গেছেন, অগ্রিম টাকা ফেরতও নেবেন না।

বস্তা বিক্রেতা যা বললেন

পৌরশহরের বস্তা বিক্রেতা সাজু সাহা বলেন, ‘পাটের দাম বেশি হওয়ায় বস্তার দাম বেড়ে গেছে। আলু সংগ্রহের মৌসুমে প্রতি বছরই বস্তার চাহিদা বাড়ে। এবার একটু বেশি দাম বেড়েছে। চাহিদা অনুযায়ী বস্তা পাওয়া যাচ্ছে না।’

ফুলবাড়ী পাইকারি আলু ব্যবসায়ী জয়ন্ত সাহা বলেন, ‘কয়দিন আগেও ক্যারেজ জাতের আলু পাইকারি বাজারে ১৬ থেকে ১৭ টাকা বিক্রি হলেও এখন একই আলু ১২ থেকে ১৩ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। পাটের বস্তার সংকটের কারণেই বাজারে আলুর দাম কমে এসেছে।’

কোল্ড স্টোরেজের তথ্য

ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের প্রধান হিসাবরক্ষক আবুল হাসান জানান, তাদের কোল্ড স্টোরেজের ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৬৫ হাজার বস্তা। প্রতি বস্তার ওজন ৫৫ কেজি। তবে ইতিমধ্যে তাঁরা ১ লাখ ৭১ হাজার বস্তা সংগ্রহ করেছেন। ধারণক্ষমতার চেয়ে ৬ হাজার বস্তা বেশি সংগ্রহ করা হয়েছে। বস্তার সংকটের মধ্যেই তাদের সংগ্রহ অভিযান শেষ করতে হয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, ‘এ ধরনের বস্তা সংকটের কথা কেউ আমাদের জানাননি। আর জানলেও এ ব্যাপারে আমাদের কিছুই করার নেই। আমরা বড়জোর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করতে পারি।’

উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৮ হাজার ৮০ হেক্টর। চাষ হয়েছে একই পরিমাণ জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩৫ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন আলু। ফলন ভালো হলেও বস্তাসংকট চাষিদের স্বস্তি পেতে দিচ্ছে না।

স্থানীয় চাষিরা দ্রুত বস্তার দাম নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ বাড়ানোর জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।