bogra times
ঢাকাবুধবার , ২১ জানুয়ারি ২০২৬

২০২৫ সালে সড়কে মৃত্যুতে রেকর্ড, প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজার ৪৯০ জন

নিউজ ডেস্কঃ-
জানুয়ারি ২১, ২০২৬ ৭:৪১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ডেস্ক প্রতিবেদক |

২০১৮ সালের ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক টার্নিং পয়েন্ট। সেই আন্দোলনের ওপর ভর করেই ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা শুরু। অথচ বিআরটিএর সর্বশেষ তথ্য বলছে, নিরাপদ সড়কের সেই দাবি আজও পূরণ হয়নি। ২০২৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজার ৪৯০ জন—যা বিআরটিএর রেকর্ড অনুযায়ী দেশের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা।

আট বছরে মৃত্যু বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি

বিআরটিএর পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৮ সালে যখন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়কের শৃঙ্খলার দাবিতে রাজপথে নেমেছিল, তখন নিহতের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৬৩৫। সাত-আট বছরের ব্যবধানে সেই সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। বিগত সরকারের আমলে সড়ক আইন পাস হলেও শাস্তির পরিমাণ কমানো এবং গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোকে জামিনযোগ্য করার ফলে আইনের কার্যকারিতা হারায়। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মৃত্যুর মিছিল থামেনি, বরং প্রতি বছরই তা ৪ থেকে ৫ হাজারের ঘরে ঘোরাফেরা করেছে।

একনজরে সড়কে মৃত্যুর পরিসংখ্যান: | সাল | নিহতের সংখ্যা | ২০১৮ | ২,৬৩৫ | | ২০২১ | ৫,০৮৪ | | ২০২৪ | ৫,৪৮০ | | ২০২৫ | ৫,৪৯০ |

অন্তর্বর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল পরিবহন খাতের আমূল সংস্কার। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, সরকার সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। উল্টো এই সময়ে সড়কে বিশৃঙ্খলা আরও বেড়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন মনে করেন, এটি আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার এক ঐতিহাসিক ব্যর্থতা। তিনি বলেন, “পরিবহন মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সরকার সবসময় বিশৃঙ্খল এক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখে, যার বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ।”

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, “সড়কে অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি এবং ব্যাটারিচালিত রিকশার মতো যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। পরিবহন খাতের সরকারি-বেসরকারি স্টেকহোল্ডাররা সংস্কারে সরকারকে সহযোগিতা করেনি। এটি আগামী সরকারের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।”

বর্তমানে দেশে প্রায় ৭৫ হাজারের বেশি বাস ও ট্রাক রয়েছে যাদের অর্থনৈতিক আয়ু অর্থাৎ মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এসব গাড়ি সরানোর জন্য ছয় মাসের সময় দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুবই নগণ্য।

২০২৫ সালে সড়কে মৃত্যুতে রেকর্ড, প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজার ৪৯০ জন

দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সড়ক দুর্ঘটনার ১৩টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে:

বেপরোয়া গতি ও চালকদের অদক্ষতা।

ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো ও লক্কড়ঝক্কড় যানবাহন।

ট্রাফিক আইন প্রয়োগে দুর্বলতা ও গণপরিবহনে চাঁদাবাজি।

বিআরটিএর সক্ষমতা ও জবাবদিহিতার অভাব।

সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন অবশ্য দাবি করেছেন যে, সরকার শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ করছে। তার মতে, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বড় প্রকল্প, চালকদের ৬০ ঘণ্টার বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, চোখের চিকিৎসা এবং জিপিএস ট্র্যাকার স্থাপনের মতো পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের সুফল আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, সংস্কারের যে রক্তক্ষয়ী স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষার্থীরা রাজপথে জীবন দিয়েছিল, সড়কে মৃত্যুর এই রেকর্ড কি সেই স্বপ্নের প্রতিফলন?