bogra times cover image-1
ঢাকাসোমবার , ৮ জুন ২০২৬

বগুড়া রেলস্টেশন স্থানান্তর ভাবনা: দূরত্ব বাড়লে কমবে যাত্রী

বগুড়া প্রতিনিধিঃ-
জুন ৮, ২০২৬ ৯:১২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের স্মৃতিবিজড়িত বগুড়া শহর। এক সময় ছিল বাংলার রাজধানী, আজ উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এই ঐতিহ্যবাহী শহরের বুকে ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা রেলস্টেশনটি শুধু একটি যাতায়াতের মাধ্যম নয়—এ যেন শহরের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন মেঘ ঘনিয়ে এসেছে বগুড়ার মানুষের মনে। শহরের কেন্দ্র থেকে রেলস্টেশন ও রেললাইন বাইরে সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাব্য পরিকল্পনার খবরে তীব্র উদ্বেগ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, ১৮৯৯ সালে সান্তাহার থেকে ফুলছড়ি পর্যন্ত ৯৪ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের সময়ই স্থাপিত হয় বগুড়া রেলস্টেশন। ১৯০০ সালের দিকে এর উদ্বোধন হয়। তারপর থেকে এই স্টেশনটি ক্রমেই হয়ে ওঠে উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র। প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী এবং আজিজুল হক কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা স্বল্প খরচে যাতায়াত করেন এ স্টেশন ব্যবহার করে। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হওয়ায় যাত্রীরা সহজেই পৌঁছে যান তাদের গন্তব্যে—এই সুবিধা আজ একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বগুড়ার অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে মিশে আছে।

শুখান পুকুর, কলেজ স্টেশন, ভেলুরপাড়া, গাবতলী, আদমদীঘি, তালোড়া, কাহালু—এই সব এলাকা থেকে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ বগুড়া শহরে আসেন কাজ, ব্যবসা ও পড়াশোনার টানে। তাদের কাছে এই স্টেশনটি প্রাণের স্পন্দন। স্থানীয়দের একাংশ বলছেন, “স্টেশন শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়া হলে আমাদের অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হবে। যা সময় ও অর্থ দুই দিক থেকেই অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে।”

শুধু যাত্রীসেবাই নয়, রেলপথকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গুদাম, পরিবহনসেবা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ, যারা তুলনামূলক কম খরচে ট্রেনে যাতায়াত করেন, তাদের উপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপবে। সেটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

যানজট নিরসনের যুক্তিতে রেললাইন অপসারণের চিন্তা চলছে বলে জানা গেছে। কিন্তু নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থানীয়দের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন—যানজটের একমাত্র কারণ কি রেললাইন?

বগুড়া শহরের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ফুটপাত দখল, রাস্তার ওপর অবৈধ দোকান স্থাপন, দোকানের পণ্য দিয়ে ফুটপাতের বড় অংশ দখল করে রাখা, সড়কে অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং, ট্রাফিক আইন অমান্য, অটোরিকশা ও ভ্যানের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল—এই কারণগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট সৃষ্টি করে। অথচ রেলক্রসিংয়ে গেট বন্ধ থাকে সাধারণত দুই থেকে তিন মিনিট। তাই যানজটের জন্য রেললাইনকে দায়ী করা মোটেও বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

শহরের গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংগুলোতে ওভারপাস, আন্ডারপাস কিংবা ফ্লাইওভার নির্মাণের মাধ্যমে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখা সম্ভব। তাতে রেলও থাকবে, সড়ক যোগাযোগও নির্বিঘ্ন থাকবে এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করে রেললাইন স্থানান্তরের প্রয়োজন হবে না।

নগর পরিকল্পনাবিদদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বিশ্বের অধিকাংশ প্রাচীন ও উন্নত শহরের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন শহরের মাঝেই অবস্থিত। কারণ একটি শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জনজীবনের কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে রেলযোগাযোগের সরাসরি সংযোগ নগর উন্নয়নের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, শহরের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনকে আধুনিকায়ন করে গণপরিবহন, সড়কপথ ও নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করাই অধিক কার্যকর সমাধান।

পত্রপত্রিকা ও জনমতের আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে উঠে এসেছে, যানজট সমস্যার পেছনে রেললাইন একক কারণ নয়। তাই রেললাইন অপসারণের পরিবর্তে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে সমাধান খোঁজা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

স্থানীয়দের স্পষ্ট দাবি, বগুড়া শহরের ঐতিহ্য, অর্থনীতি, যাত্রীস্বার্থ এবং নাগরিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে বর্তমান স্থানেই রেলস্টেশন বহাল রাখা হোক। যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে গণশুনানি, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি করা উচিত। অন্যথায় বগুড়া শহর থেকে রেলস্টেশন অপসারণের সিদ্ধান্ত জনস্বার্থবিরোধী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সত্যি বলতে কী, একটি শহরের হৃদয় থেকে রেলস্টানকে সরিয়ে দেওয়া মানে সেই শহরের স্পন্দনকে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো। বগুড়ার মানুষ এখন অপেক্ষায়—কান পাতছে প্রশাসনের দিকে। ঐতিহ্য আর উন্নয়নের এই জটিল দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটবে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা? সময়ই বলবে।