bogra times Add
ঢাকাশনিবার , ২৮ মার্চ ২০২৬

ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটে জিম্মি রোগীরা

Link Copied!

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিয়ে চরম নৈরাজ্যের অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের সামনে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ফেলে রেখে চালক মো. মানিক বেশির ভাগ সময় বাসায় বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকেন বলে জানা গেছে। ফলে হাসপাতাল থেকে স্থানান্তরিত মুমূর্ষু রোগীরা সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এতে দরিদ্র রোগীদের অতিরিক্ত খরচ মেটাতে হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, ব্যক্তি বিশেষের বেসরকারিভাবে পরিচালিত (প্রাইভেট) অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে সুবিধা করে দিতেই সুকৌশলে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ রাখা হচ্ছে। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক খেয়ালখুশিমতো অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেন।

মুমূর্ষু রোগী নিয়ে চালকের মিথ্যাচার

গত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৫টায় উপজেলার বারাইহাট এলাকায় দুটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে রংপুর সদরের বাসিন্দা সুভাস চন্দ্র (৫০) ও ফুলবাড়ী পৌরশহরের সুজাপুরের দীপেন চন্দ্র (৪০) গুরুতর আহত হন। সোয়া ৬টার দিকে তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের দিনাজপুর ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন।

একইভাবে মুমূর্ষু অবস্থায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয় উত্তর সুজাপুর গ্রামের হাফিজা বেগমকে (৩২)। তারও অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসক তাকেও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন।

এ সময় স্বজনরা সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য চালক মো. মানিককে একাধিকবার ফোন দেওয়ার পর তিনি ফোন ধরে জানান, রোগী নিয়ে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছেন, আসতে ঘণ্টা খানেক সময় লাগবে। রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় স্বজনরা বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করে ব্যক্তি মালিকানাধীন অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়ে রোগীদের রংপুর ও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

পরিকল্পিত হয়রানির অভিযোগ

ভুক্তভোগী স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও বাড়তি টাকা দিয়ে প্রাইভেট গাড়ি নিতে হবে কেন? এটা পরিকল্পিত হয়রানি।

পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওইদিন ওই সময় অ্যাম্বুলেন্স চালক মো. মানিক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ক্যাম্পাসের বাসাতেই ছিলেন। রোগী বহন না করার অজুহাতে তিনি এমন মিথ্যাচার করেছেন।

চালকের যা বলছেন

অভিযোগের বিষয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালক মো. মানিক বলেন, “শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমি কিছুক্ষণের জন্য বাসায় বিশ্রামে গিয়েছিলেন। ওই অবস্থায় রোগীকে নিয়ে গেলে যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা ছিল তাই রোগী বহন করিনি। বেশ কিছুদিন থেকে আমার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।”

স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. নূর ই আলম খুশরোজ আহমেদ আনন্দ বলেন, “কিছুদিন আগে অ্যাম্বুলেন্স চালক মো. মানিক স্ট্রোক করেছিলেন। তার শারীরিক অবস্থা ভালো না এবং গাড়ি চালানোর মতো তার শারীরিক ফিটনেস নেই বললেই চলে।”

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মশিউর রহমান বলেন, “অ্যাম্বুলেন্স চালক মো. মানিক শারীরিকভাবে বেশ অসুস্থ। বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় তাকে দিয়েই অ্যাম্বুলেন্স চালাতে হচ্ছে।”

সাধারণ রোগীদের দুর্ভোগ

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুধু ওই দিনই নয়, দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি নিয়মিত সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রায়ই রোগীদের স্বজনদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে হচ্ছে। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে রোগী পরিবহনে রোগীর স্বজনদেরকে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়, যা দরিদ্র রোগীদের জন্য বড় আর্থিক চাপ।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি পড়ে থাকলেও রোগী বহনের সময় তা পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেছেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজনরা।

প্রশাসনের করণীয়

এমন অবস্থায় সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু রাখতে বিকল্প চালক নিয়োগ বা শারীরিকভাবে সুস্থ চালক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। অন্যথায় মুমূর্ষু রোগীদের জীবনহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন তারা।

উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সুত্রে।