bogra times cover image-1
ঢাকারবিবার , ২৬ জুলাই ২০২৬

জনবল ও ওষুধ সংকটে শেরপুরের ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শহর নির্ভর স্বাস্থ্যসেবা

এনাম হকঃ-
জুলাই ২৬, ২০২৬ ১:১২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

প্রাথমিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত গ্রামবাসী, প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যও ছুটতে হচ্ছে উপজেলা হাসপাতাল ও ক্লিনিকে।

এনাম হক, শেরপুর (বগুড়া) থেকে:

গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু জনবল সংকট, প্রয়োজনীয় ওষুধের অপ্রতুলতা, অবকাঠামোর অবনতি ও দীর্ঘদিনের অবহেলায় বগুড়ার শেরপুর উপজেলার অধিকাংশ কেন্দ্র এখন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অনেক কেন্দ্রই দিনের পর দিন তালাবদ্ধ থাকে। ফলে সামান্য জ্বর-সর্দি বা ডায়রিয়ার মতো সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্যও মানুষকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকে ছুটতে হচ্ছে। এতে একদিকে বাড়ছে রোগীদের ভোগান্তি, অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও বাড়ছে চিকিৎসাসেবার চাপ। শনিবার (২৫ জুলাই) উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে ভবানীপুর ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল রয়েছে। তবে ১৯৭৭ সালে নেদারল্যান্ডস সরকারের আর্থিক সহায়তায় রিসার্চ ডেটা এনালাইসিস (আরডিএ) প্রকল্পের আওতায় প্রতিষ্ঠিত বিশালপুর ও গাড়ীদহ এলাকার দুটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ হয়নি।

গাড়ীদহ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে একটি ভবন সংস্কার করা হলেও পাশের ভবনগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। বিশালপুরের পেচুল স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবস্থাও প্রায় একই। কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, কোথাও ভবনের চারপাশে পানি জমে আছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অনেক কেন্দ্রই এখন পরিত্যক্ত ভবনের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। কুসুম্বিতে জায়গা থাকলেও এখনো কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতির কারণে অনেক চিকিৎসককে একাধিক কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে নিয়মিত সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় ওষুধের সরবরাহও অনেক কম। জ্বর, সর্দি, ডায়রিয়া কিংবা ছোটখাটো আঘাতের চিকিৎসার জন্যও নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হচ্ছে।

এদিকে সুঘাট উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ভেঙে সেখানে ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে চারজন নিয়মিত এবং চারজন আউটসোর্সিং কর্মী থাকলেও মেডিকেল অফিসারের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ফলে প্রসূতি ও মা-শিশু স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। ডেলিভারির জন্য রোগীদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা বেসরকারি ক্লিনিকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বর্তমানে তৃণমূল পর্যায়ে তিনটি পৃথক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা পরিচালিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের অধীনে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে পরিবার কল্যাণ সহকারী (এফডব্লিউএ) দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, একই ধরনের সেবা তিনটি পৃথক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় সমন্বয়ের কিছু সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এ কারণে সরকার তিনটি ব্যবস্থাকে একীভূত করে সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে।

পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় সুঘাটে একটি ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া ছয়টি ইউনিয়নে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং সীমাবাড়িতে পূর্ণ জনবল নিয়ে একটি মডেল সেবা কেন্দ্র চালু রয়েছে। তবে ওষুধের সংকটও প্রকট। নিয়ম অনুযায়ী ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে রোগীরা পাচ্ছেন মাত্র তিন থেকে চার ধরনের প্রাথমিক ওষুধ।

জনবল সংকটও প্রায় সব কেন্দ্রেই প্রকট। সুঘাটে ছয়জন মাঠকর্মীর বিপরীতে কর্মরত আছেন চারজন, নেই কোনো পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা। গাড়ীদহে ছয়জনের স্থলে চারজন, খামারকান্দিতে ছয়জনের স্থলে তিনজন, খানপুরে ছয়জনের স্থলে তিনজন মাঠকর্মী রয়েছেন। সেখানে একজন পরিদর্শিকা থাকলেও জনবল পূর্ণ নয়। মির্জাপুরে সাতজনের বিপরীতে পাঁচজন মাঠকর্মী কর্মরত। ভবানীপুরে চারজন মাঠকর্মী থাকলেও নেই কোনো পরিদর্শিকা। বিশালপুরে ছয়জনের স্থলে তিনজন মাঠকর্মী রয়েছেন, সেখানে পরিদর্শিকাও নেই। সীমাবাড়িতে ছয়জনের স্থলে মাত্র দুইজন মাঠকর্মী কর্মরত। এ ছাড়া পৌরসভায় পরিবার পরিকল্পনা সুপারভাইজার ও পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ জানিয়েছে, মাঠ পর্যায়ের কয়েকটি সেবা কেন্দ্র সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। খানপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি শাহ বন্দেগী ইউনিয়নে নতুন একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি গাড়ীদহ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। একটি ভবন সংস্কার করা হলেও পাশের ভবনগুলোর দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে। চারপাশ আগাছায় ভরে গেছে। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কেন্দ্রটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদৌস আলম বলেন, “সামান্য চিকিৎসার জন্যও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেলে বেশির ভাগ সময় তালা ঝুলতে দেখি।”

আরেক বাসিন্দা শাহাদত হোসেন বলেন, “সরকার ভবন নির্মাণ করেছে, কিন্তু চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় মানুষ কোনো সুফল পাচ্ছে না।”

বিশালপুর ইউনিয়নের পেচুল স্বাস্থ্যকেন্দ্র এলাকার বাসিন্দা মাসুদুর রহমান বলেন, “স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকলেই পরিত্যক্ত ভবনের মতো পরিবেশ দেখা যায়। চারপাশে পানি জমে আছে, ভবন জরাজীর্ণ, বিদ্যুৎ সংযোগও নেই। অধিকাংশ সময় কেন্দ্র তালাবদ্ধ থাকে। দ্রুত সংস্কার করে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা চালু করা উচিত।”

জনবল ও ওষুধ সংকটে শেরপুরের ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শহর নির্ভর স্বাস্থ্যসেবা

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, “আরডিএ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর শুধু ভবনগুলো স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল দেওয়া হয়নি। কেন্দ্রগুলো চালুর জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। ভবানীপুর উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে জনবল রয়েছে। অনুমোদন ও বরাদ্দ পেলে অন্য কেন্দ্রগুলোও পুনরায় চালু করে মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।”

উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আব্দুল আলীম বলেন, “কুসুম্বি, গাড়ীদহ ও বিশালপুর ইউনিয়নে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের নিজস্ব কোনো সেবা কেন্দ্র নেই। মাঠ পর্যায়েও জনবলের ঘাটতি রয়েছে। তবে নিয়োগ কার্যক্রম চলমান। কয়েকটি কেন্দ্রে সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন। পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে আরও ভালো স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে। সরকার থেকে যে পরিমাণ ওষুধ পাওয়া যায়, তা নির্দেশনা অনুযায়ী বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়।”