bogra times Add
ঢাকামঙ্গলবার , ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ভারতের চিকেন্স নেক ও সুড়ঙ্গ রেলপথ: নেপথ্যে কি বড় সামরিক কৌশল?

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ-
ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬ ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ডেস্ক প্রতিবেদক | 

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগকারী অত্যন্ত সংকীর্ণ ও স্পর্শকাতর ‘চিকেন্স নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোরে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ কেটে রেললাইন বসানোর পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত করেছে ভারত সরকার। একই সঙ্গে আসামে ব্রহ্মপুত্র নদের তলদেশ দিয়ে দেশের প্রথম রেল-সড়ক সুড়ঙ্গপথ তৈরির মেগা প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ‘অদৃশ্য রেলপথ’ হবে গেম চেঞ্জার।

‘চিকেন্স নেক’ করিডোরে সুদীর্ঘ সুড়ঙ্গ

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার তিন মাইল হাট থেকে শিলিগুড়ির রাঙাপাণি হয়ে বাগডোগরা পর্যন্ত প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। উত্তর-পূর্ব রেলওয়ের মুখপাত্র কপিঞ্জল কিশোর শর্মা জানিয়েছেন, প্রকল্পটির কারিগরি নকশা প্রস্তুত এবং এটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবও এই প্রকল্পের গুরুত্ব নিশ্চিত করেছেন।

প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্য:

  • দৈর্ঘ্য: ৩৫.৭৬ কিলোমিটার।

  • অবস্থান: নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশ সীমান্তের অত্যন্ত কাছে।

  • ব্যয়: আনুমানিক ১২ হাজার কোটি ভারতীয় রুপি।

  • প্রযুক্তি: অত্যাধুনিক টানেল বোরিং মেশিন (TBM) দিয়ে দুটি সমান্তরাল সুড়ঙ্গ তৈরি করা হবে।

ব্রহ্মপুত্রের নিচে ভারতের প্রথম রেল-সড়ক সুড়ঙ্গ

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ক্যাবিনেট কমিটিতে আসামের ব্রহ্মপুত্র নদের নিচ দিয়ে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটি হবে ভারতের প্রথম প্রকল্প যেখানে একই সুড়ঙ্গ দিয়ে ট্রেন এবং অন্যটি দিয়ে গাড়ি চলাচল করবে। এর ফলে নুমালিগড় ও গোহপুরের মধ্যে বর্তমানের ৬ ঘণ্টার পথ মাত্র কয়েক মিনিটে নেমে আসবে।

নেপথ্যে কি শুধুই যাত্রী পরিবহন?

যদিও বলা হচ্ছে এই পথ দিয়ে সাধারণ যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করবে, তবে বিশ্লেষকরা এর সামরিক গুরুত্বকেই সবার উপরে রাখছেন। ১. নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা: ‘চিকেন্স নেক’ করিডোরটি মাত্র ২০-২২ কিলোমিটার চওড়া। শত্রুদেশের ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান হামলা হলেও মাটির নিচের এই মোটা কংক্রিটের সুড়ঙ্গ দিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো সম্ভব হবে। ২. ঘাঁটির সংযোগ: এই রেলপথটি বাগডোগরা বিমান ঘাঁটি এবং ব্যাঙডুবিতে অবস্থিত ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩৩ কোরের সদর দপ্তরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রক্ষা করবে। ৩. প্রাকৃতিক দুর্যোগ: পাহাড়ি অঞ্চলে ধস বা বন্যায় ওপরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও ভূগর্ভস্থ পথ সচল থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার প্রবীর সান্যাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, “চীন যদি ভুটান হয়ে শিলিগুড়ি করিডোরে আক্রমণ চালায়, তবে এই সুড়ঙ্গ পথ হবে জীবনরেখা। এটি অন্তত ২০ বছর আগেই করা উচিত ছিল।”

অন্যদিকে কৌশলগত বিশ্লেষক প্রতীম রঞ্জন বসুর মতে, ভারতের বর্তমান সব অবকাঠামোই সামরিক সক্ষমতাকে মাথায় রেখে করা হচ্ছে। এই সুড়ঙ্গগুলো এমনভাবে তৈরি করা হবে যাতে সৈন্যরা অন্তত ৩০ দিন ভেতরে অবস্থান করতে পারে।

সব মিলিয়ে, শিলিগুড়ি থেকে আসাম পর্যন্ত এই বিশাল কর্মযজ্ঞ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভূ-রাজনীতি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা