bogra times Add
ঢাকাসোমবার , ১৩ এপ্রিল ২০২৬

মার্চে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৩২ প্রাণহানি, প্রতিদিন গড়ে নিহত ১৭.১৬ জন

নিউজ ডেস্কঃ-
এপ্রিল ১৩, ২০২৬ ১১:৪৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মার্চ মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫৭৬টি। এতে নিহত হয়েছেন ৫৩২ জন এবং আহত হয়েছেন ২২২১ জন। নিহতের মধ্যে নারী ৬৬ জন ও শিশু ৯৮ জন। এ সময় ১৪টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত, ২৭ জন আহত ও ৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়া ৪৮টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ৬৭ জন নিহত ও ২২৪ জন আহত হয়েছেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বৃহস্পতিবার (১১ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সংস্থাটি।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতের হার সবচেয়ে বেশি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ মাসে ২১৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২০৪ জন, যা মোট নিহতের ৩৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৮ দশমিক ০২ শতাংশ। এছাড়া দুর্ঘটনায় ৭৯ জন পথচারী নিহত হয়েছেন (১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ) এবং যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৬৬ জন (১২ দশমিক ৪০ শতাংশ)।

যানবাহনভিত্তিক নিহতের চিত্রে দেখা যায়—

  • মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী: ২০৪ জন (৩৮.৩৪%)

  • থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা): ৯৪ জন (১৭.৬৬%)

  • প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস আরোহী: ৪৬ জন (৮.৬৪%)

  • বাসের যাত্রী: ৪৫ জন (৮.৪৫%)

  • ট্রাক-পিকআপ-ট্রাক্টর আরোহী: ২৮ জন (৫.২৬%)

  • স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী: ২৩ জন (৪.৩২%)

  • বাইসাইকেল আরোহী: ১৩ জন (২.৪৪%)

আঞ্চলিক সড়কে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা

দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৬৪টি (৪৫.৮৩%) আঞ্চলিক সড়কে, ১৭১টি (২৯.৬৮%) জাতীয় মহাসড়কে, ৭০টি (১২.১৫%) গ্রামীণ সড়কে এবং ৬২টি (১০.৭৬%) শহরের সড়কে ঘটেছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়— ২৩১টি (৪০.১০%) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১৬৬টি (২৮.৮১%) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৮৬টি (১৪.৯৩%) পথচারীকে চাপা/ধাক্কা, ৮২টি (১৪.২৩%) যানবাহনের পেছনে আঘাত করে।

ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি

ঢাকা বিভাগে ১২৬টি দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন নিহত হয়েছেন। সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ২৭টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ৪৬টি দুর্ঘটনায় নিহত ২৮ জন ও আহত ৬৯ জন।

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান:

  • ঢাকা: দুর্ঘটনা ২১.৮৭%, নিহত ২৫.৭৫%

  • চট্টগ্রাম: দুর্ঘটনা ২১.৭০%, নিহত ১৯.১৭%

  • রাজশাহী: দুর্ঘটনা ১৩.১৯%, নিহত ১২.৪০%

  • খুলনা: দুর্ঘটনা ১৩.৫৪%, নিহত ১৩.৫৩%

  • রংপুর: দুর্ঘটনা ১০.৭৬%, নিহত ৯.৯৬%

  • ময়মনসিংহ: দুর্ঘটনা ৭.৬৩%, নিহত ৬.৫৭%

  • বরিশাল: দুর্ঘটনা ৬.৭৭%, নিহত ৬%

  • সিলেট: দুর্ঘটনা ৪.৬৮%, নিহত ৪.৮৮%

প্রতিদিন গড়ে নিহত বেড়েছে ১১.২৮%

গত ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছিল ১৫ দশমিক ৪২ জন। মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ১৬ জন। অর্থাৎ প্রাণহানি বেড়েছে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।

নিহতদের পেশাগত পরিচয়

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, নিহতদের মধ্যে ৭৯ জন শিক্ষার্থী, ৩১ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ২৭ জন স্থানীয় ব্যবসায়ী, ১৭ জন ব্যাংক-বীমা কর্মকর্তা-কর্মচারী, ১৪ জন শিক্ষক, ১২ জন এনজিও কর্মী, ৯ জন পোশাক শ্রমিক, ৫ জন সাংবাদিক, ৩ জন আইনজীবী, ২ জন চিকিৎসক, ২ জন পুলিশ সদস্য, ৪ জন মসজিদের ইমাম/খাদেমসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন।

ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। এই গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি ও চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ জরুরি।

প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে— ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।

১২ দফা সুপারিশ

দুর্ঘটনা রোধে ফাউন্ডেশন ১২ দফা সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—

১. জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল (এনআরএসসি) পুনর্গঠন করে এটির অধীনে বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএ পরিচালনা
২. বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর কাঠামোগত সংস্কার ও শীর্ষ পদে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ
৩. মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক
৪. মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে প্রত্যাহার
৫. রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু
৬. বিআরটিসির বাস সংখ্যা বৃদ্ধি ও সেবা উন্নয়ন
৭. দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও তাদের বেতন-কর্মঘন্টা-স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ
৮. স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ
৯. সব রেল ক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ
১০. সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতায় জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ
১১. প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ
১২. সড়ক, রেল ও নৌ-পরিবহন একত্রিত করে একটি সমন্বিত যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন

ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, সময়োপযোগী নীতিমালা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অতীব জরুরি।