bogra times Add
ঢাকারবিবার , ৭ জুন ২০২৬

শেরপুরের নার্সারির চারায় সবুজ হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়

এনাম হকঃ-
জুন ৭, ২০২৬ ১০:৫৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

এনামুল হক, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি:

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের পাহাড়ি ঢালগুলো এখন সারি সারি সবুজ গাছে ছেয়ে গেছে। চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির এই সবুজের মূল উৎস কিন্তু উত্তরবঙ্গের বগুড়ার শেরপুর উপজেলার মহিপুর এলাকা। তিন দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এখানকার নার্সারি শিল্প এখন বার্ষিক প্রায় ১০ কোটি টাকার বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে, যেখানে জীবিকা নির্বাহ করছেন হাজারো মানুষ।

শেরপুরের গাড়িদহ ইউনিয়নের মহিপুর এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে ১০০ থেকে ১২০টি নার্সারি। আশপাশের এলাকায় আরও ৩০-৪০টি ছোট নার্সারি যুক্ত হলে পুরো অঞ্চলটি দেশি-বিদেশি ফলজ, বনজ ও ফুলের চারা উৎপাদন ও সরবরাহের বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এখানকার নার্সারিগুলোতে পাওয়া যায় আমের মিয়াজাকি, হাড়িভাঙ্গা, আম্রপালি, চেংমাই, চাকাপাশি সূর্যডিমসহ বিভিন্ন উন্নত ফলের চারা। বনজ গাছের মধ্যে মেহগনি, বেলজিয়াম ও লম্বু গাছের চারার চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

নার্সারি মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, এখানকার উৎপাদিত চারার সবচেয়ে বড় বাজার পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা। এর বাইরে সিলেটের বিয়ানীবাজার, শাহপরান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জসহ বরিশাল, ময়মনসিংহ, রংপুর, ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় নিয়মিত চারা সরবরাহ করা হয়। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, পার্বত্য অঞ্চলে সরবরাহকৃত চারার প্রায় ৭০ শতাংশই আসে শেরপুর থেকে, বাকি ৩০ শতাংশ আসে উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জেলা থেকে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৯৯২ সালে অল্প পরিসরে শুরু হওয়া এই শিল্প সময়ের সঙ্গে বড় বাণিজ্যিক খাতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখান থেকে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার চারা বিক্রি হয়। সরাসরি কয়েকশ মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরোক্ষভাবে প্রায় এক হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভর করে নার্সারি ব্যবসার ওপর।

বরিশাল থেকে চারা কিনতে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী মো. সোহেল বলেন, “এখানকার আম, মেহগনি, কাঁঠাল, রামবুটান ও লিচুর চারার মান ভালো। তাই দূর-দূরান্ত থেকে আমরা এখানে আসি।”

শেরপুর উপজেলা নার্সারি মালিক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম জানান, ১৯৯৬ সালে তিনি নার্সারি ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে প্রায় ৭০ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা তাঁর নার্সারিতে প্রায় ৫০০ প্রজাতির গাছ রয়েছে। এখান থেকে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চারা সরবরাহ করা হয়।

ইসলাম নার্সারি অ্যান্ড সিডের স্বত্বাধিকারী আমিনুল ইসলাম বলেন, “১৯৯২ সালে মাত্র তিন শতক জমিতে ৩০০ টাকার ৬০০টি মেহগনি চারা দিয়ে যাত্রা শুরু করি। পরে সেগুলো ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করি। ১৯৯৪ সাল থেকে আমের চারা উৎপাদন শুরু করি। এখন আমাদের নার্সারিতে শতাধিক প্রজাতির গাছ রয়েছে।” তিনি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বিএডিসি ও কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ নিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিতে চারা উৎপাদন করছেন। বিশেষ করে মাল্টি গ্রাফটিং পদ্ধতিতে উন্নত জাতের আমের চারা উৎপাদন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ছাদ বাগানের প্রসারের কারণে ছোট আকারের ফলদ চারার চাহিদাও বাড়ছে।

তবে সম্ভাবনাময় এই শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার অভাব তাদের বড় চ্যালেঞ্জ। সার সংকটের সময়ে প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ, স্বল্প সুদের কৃষিঋণ এবং নার্সারি খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দার বলেন, নার্সারি তালিকাভুক্ত করে নিবন্ধনের মাধ্যমে সরকারকে আয়ের পথ দেখানো হচ্ছে। নার্সারি শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে মাঠপর্যায়ে তাদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হয়।

উপজেলা ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা মো. সালাহউদ্দীন পারভেজ বলেন, মানুষকে সামাজিকভাবে উদ্বুদ্ধ করতে বন বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। নার্সারি শিল্প পরিবেশবান্ধব একটি খাত। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে।