bogra times Add
ঢাকাসোমবার , ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ব্যাখ্যা

নিউজ ডেস্কঃ-
ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬ ৭:৪৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে চলমান আলোচনা ও বিতর্কের প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টার স্বীকৃত ফেসবুক পেইজে একটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে। দীর্ঘ নয় মাসের আলোচনার পর এই চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।

চুক্তির পটভূমি

সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র নির্বাহী আদেশ নম্বর ১৪২৫৭ জারি করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করে। এর পরপরই বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করে এবং আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক প্রত্যাহার বা হ্রাসের অনুরোধ জানায়। যুক্তরাষ্ট্র পরে একটি অভিন্ন পারস্পরিক শুল্ক চুক্তির খসড়া বিভিন্ন বাণিজ্য অংশীদার দেশের কাছে পাঠায়। আলোচনায় অংশ নেওয়া দেশগুলোর ক্ষেত্রে শুল্ক পুনর্মূল্যায়নের পর বাংলাদেশের জন্য প্রাথমিকভাবে হার নির্ধারিত হয় ২০ শতাংশ।

দরকষাকষির ফলাফল

দীর্ঘ প্রায় নয় মাসের ধারাবাহিক আলোচনা শেষে বাংলাদেশ শুল্কহার ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করেছে সরকার। এই আলোচনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নেতৃত্ব দেয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল।

চুক্তির কাঠামো

চুক্তিতে পণ্য ও সেবাবাণিজ্য, শুল্ক ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ, উৎপত্তি নীতি, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরকারি ক্রয়, শ্রম, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতাসহ বিস্তৃত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সরকার বলছে, বাংলাদেশ আগে থেকেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিভিন্ন চুক্তির অংশীদার হওয়ায় নতুন করে কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়নি।

তৈরি পোশাক খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা

চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে তৈরি পোশাক খাতকে তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তা দিয়ে তৈরি পোশাক পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে সেই পণ্যের ওপর শূন্য শুল্ক সুবিধা প্রযোজ্য হবে। ফলে নির্ধারিত ১৯ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে না। বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্রগামী রপ্তানির বড় অংশ তৈরি পোশাকনির্ভর হওয়ায় এই ব্যবস্থাকে সরকার কৌশলগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছে।

উৎপত্তি নীতিতে নমনীয়তা

উৎপত্তি নীতির ক্ষেত্রেও নমনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দেশীয় বা বিদেশি মূল্য সংযোজনের নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ না থাকায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হবে বলে সরকারের দাবি।

বাজারে প্রবেশাধিকার

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রায় আড়াই হাজার পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা পাওয়া যাবে। এর মধ্যে ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক ও কাঠজাত পণ্যের উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য সাত হাজারের বেশি শুল্ক শ্রেণিতে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বাণিজ্য সহজীকরণ ও ডিজিটালাইজেশন

কাগজবিহীন বাণিজ্য ব্যবস্থার আওতায় কাস্টমস প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা, ইলেকট্রনিক নথি ও সনদ গ্রহণ এবং সীমান্তে দ্রুত পণ্য খালাসের সুযোগ তৈরি হবে। মেধাস্বত্ব সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োগ জোরদার, সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যোগদান এবং নকল পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অশুল্ক বাধা ও কারিগরি প্রতিবন্ধকতা হ্রাস

মান নির্ধারণ, পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও সনদ স্বীকৃতির প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সনদ স্বীকৃতির ভিত্তিতে পূর্বানুমতি ছাড়াই বাজারজাত করার সুযোগের উল্লেখ রয়েছে।

কৃষি ও পরিবেশ বিষয়ক অঙ্গীকার

কৃষিপণ্য আমদানিতে স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা ব্যবস্থার স্বীকৃতি, রাসায়নিক সীমা মেনে চলা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাজারে প্রবেশাধিকার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিষয়ও ব্যাখ্যায় এসেছে। পরিবেশ সুরক্ষার অংশ হিসেবে অবৈধ, অঘোষিত ও অনিয়ন্ত্রিত আহরণে ভর্তুকি না দেওয়া এবং বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য রোধের অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে।

শ্রম আইন ও ডিজিটাল বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শ্রম আইন হালনাগাদের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতার অংশ হিসেবে তথ্য সুরক্ষা, গোপনীয়তা কাঠামো এবং সীমান্ত–পারের তথ্য প্রবাহ সংক্রান্ত নীতিগত স্বীকৃতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ ক্রয়সহ জ্বালানি, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য খাতে আমদানি বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়।

এক্সিট ক্লজ সংযোজন

চুক্তির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে সরকার বলেছে, প্রাথমিক খসড়ায় চুক্তি বাতিলের সুযোগ না থাকলেও বাংলাদেশের অনুরোধে এতে প্রস্থানের ধারা (এক্সিট ক্লজ) যুক্ত করা হয়েছে।

সরকারের মূল বক্তব্য

সার্বিকভাবে সরকার এই চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যেখানে রপ্তানি প্রতিযোগিতা বজায় রাখা, বাজার সুরক্ষা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সুফলের আশা ব্যক্ত করা হয়েছে।