bogra times Add
ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

লাঠিতে ভর করে ভোটের পথে: গণতন্ত্রের পাঠ শেখালেন ৯৫ বছরের মসকুনারা

কংকনা রায়, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি-
ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬ ৫:১২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:

বয়স মাত্র একটি সংখ্যা—শরীরে বল কমলেও মানবিক দায়িত্ববোধের কাছে তা কোনো বাধা নয়। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন সেটাই প্রমাণ করলেন ৯৫ বছরের মসকুনারা খাতুন।

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, হাতে শক্ত ভরসা লাঠি। তবু চোখে দৃঢ় প্রত্যয়, মনোবলে অটল। সকাল সকাল পরিবারের সহায়তায় সিদ্দিশি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পৌঁছে ভোটকক্ষে প্রবেশের সময় নিজেই হেঁটে গেলেন আত্মবিশ্বাসী পায়ে। মুহূর্তেই নজর কাড়লেন সবার।

একসময় ভোট দিয়ে বেরিয়ে মসকুনারা খাতুনের গলায় আবেগ ও দায়িত্বের মিশেল, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যত নির্বাচন হয়েছে, আমি চেষ্টা করেছি ভোট দিতে। যতদিন বেঁচে থাকবো, ভোটাধিকার প্রয়োগ করবো—এটা আমার দায়িত্ব।’

মসকুনারা খাতুনের জন্ম ব্রিটিশ ভারতের শাসনামলে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় দেখেছেন চোখের সামনে। একাধারে প্রত্যক্ষ করেছেন সামরিক শাসন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আর গণতন্ত্রের পথপরিক্রমা। প্রতিটি নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন, নাগরিক অধিকার প্রয়োগে কখনো কার্পণ্য করেননি। বয়স যখন ৯৫, তখনও সেই নিষ্ঠায় কোনো খামতি নেই।

তার এই দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন কেন্দ্রে উপস্থিত অন্য ভোটাররা। একজন বলেন, ‘এটাই প্রকৃত নাগরিক দায়িত্ববোধের উদাহরণ। এত বছর বয়সেও যে নিজের দায়িত্বের প্রতি এতটা সচেতন থাকা যায়, তা এই নারীই দেখিয়ে গেলেন।’

আরেক তরুণ ভোটার বলেন, ‘ঠাকুরমাকে দেখে আমাদের লজ্জা লাগছে। আমরা অনেক সময় ভোট দিতে যেতে অলসতা করি। তিনি আমাদের শিখিয়ে দিলেন গণতন্ত্র মানেই শুধু অধিকার না, এটা দায়িত্বও বটে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ হাছান বলেন, ‘বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ভোটারদের জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে আলাদা সহায়তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে মসকুনারা খাতুনের মতো সচেতন নাগরিকের উপস্থিতি আমাদের সত্যিই অভিভূত করেছে।’

দিনাজপুর-৫ আসনের ফুলবাড়ী উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৫৪ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৭৯ হাজার ৫০৯, যা পুরুষ ভোটার থেকেও বেশি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই উপজেলার ৫২টি কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বেড়েছে। নারী ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো উপজেলা যেন ভোটের উৎসবে মেতেছে।

মসকুনারা খাতুনের এই উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র টিকে থাকে শুধু প্রতিষ্ঠানের শক্তিতে নয়, টিকে থাকে প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণে। তার দৃঢ় পদচারণা শুধু ভোটকেন্দ্রের পথে হাঁটা ছিল না, তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রতি একাগ্র শ্রদ্ধা নিবেদন।

একাত্তরের চেতনায় বলীয়ান এক নারী, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন থেকে শুরু করে পথ পরিক্রমায় আজও অটল। তার লাঠির শব্দ যেন গণতন্ত্রের প্রহরে এক অবিরাম টোকা—আমরা আছি, আমরা থাকবো, আমরা ভোট দেবো।