bogra times Add
ঢাকাশনিবার , ১১ এপ্রিল ২০২৬

হিমাগারে জায়গা নেই, ফিরে যাচ্ছেন পাঁচ উপজেলার চাষি

কংকনা রায়, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
এপ্রিল ১১, ২০২৬ ১০:২৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি

দিনাজপুরের দক্ষিণ-পূর্বাংশের পাঁচ উপজেলার একমাত্র হিমাগার ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণের জায়গা না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন এলাকার আলুচাষিরা। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি আলু ঢোকানো হয়েছে। ফলে জায়গা সংকটে শতাধিক চাষিকে ফিরে যেতে হচ্ছে খালি হাতে। আলু সংরক্ষণ করতে না পারলে আগামী বছরে আলু চাষে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

সরেজমিনে গত কয়েকদিনে ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের সামনে দেখা গেছে, ট্রাক্টর, ভটভটি ও ব্যাটারিচালিত ভ্যানভর্তি আলু নিয়ে হিমাগারে ঢোকানোর জন্য অপেক্ষা করছেন বিভিন্ন এলাকার কৃষক। কিন্তু জায়গা না থাকায় হতাশা নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে তাদের। এই দৃশ্য প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হাকিমপুর উপজেলার খট্টামাধবপুর ডাঙাপাড়া গ্রামের আলুচাষি মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর তিন বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছি। একটি ট্রাক্টরে ১৯ বস্তা আলু নিয়ে হিমাগারে এসে জানতে পারি জায়গা নেই। ফিরে যেতে হচ্ছে। সময় অপচয় হচ্ছে, বাড়তি গাড়িভাড়াও গুণতে হচ্ছে।’

বাম্পার ফলন, কিন্তু জায়গা সংকট

চাষিরা বলছেন, এবার আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু বাজারে দাম কম। তাই ভালো দাম পেতে অনেকে হিমাগারে আলু রাখতে চাইছেন। হিমাগার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৬০ হাজার বস্তা (প্রতি বস্তা ৬০ কেজি ওজন)। কিন্তু ইতিমধ্যে ধারণক্ষমতার চেয়ে ১১ হাজার বস্তা বেশি নিয়ে ১ লাখ ৭১ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবুও চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না।

মমিনুল ইসলামের মতো ভোগান্তিতে পড়েছেন একই এলাকার কৃষক এরশাদ আলী, ডাঙ্গাপাড়ার জাকিরুল ইসলাম, কবির হোসেন, পার্বতীপুরের ভবানীপুরের নূরুন্নবীসহ অন্তত শতাধিক আলুচাষি।

কৃষকদের অভিযোগ

কৃষকদের অভিযোগ, হিমাগারে আলু ভরাতে কৃষকদের চেয়ে ব্যবসায়ীদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফলে কৃষকের আলু আসার আগেই ব্যবসায়ী ও ফরিয়াদের আলুতে জায়গা পূর্ণ হয়ে যায়। এতে প্রকৃত চাষিরা তাদের উৎপাদিত আলু রাখার সুযোগ পাচ্ছেন না।

নবাবগঞ্জ উপজেলার আফতাবগঞ্জের নারী কৃষক বিজলী রানী বলেন, ‘আগামী বছরে আবাদের জন্য বীজ হিসেবে ৫৫ কেজি ওজনের তিন বস্তা আলু আগেভাগে এনে হিমাগারে রেখেছি। এখন আনলে জায়গা নেই।’

উপজেলার পাকাপান গ্রামের কৃষক শাহাজাহান আলী বলেন, ‘চার বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছি। ২০ বস্তা আলু বীজ হিসেবে সংরক্ষণের ইচ্ছা ছিল। কিন্তু হিমাগারে জায়গা নেই। তাই আবাদের আলু এখন বিক্রি করে দেব। আগামীতে বীজ কিনেই আবাদ করব।’

হাকিমপুরের লোহাচড়া ডাঙ্গাপাড়ার কৃষক নূরুন্নবী বলেন, ‘দুই ট্রাক্টরে ৮০ বস্তা আলু নিয়ে এসেছিলাম। গাড়িভাড়া দ্বিগুণ পড়েছে। এখন বাজারে দাম কম, লাভের আশায় আলু রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু জায়গা না থাকায় ফিরে যাচ্ছি। বাড়তি পরিবহন খরচ গুণতে হবে।’

হিমাগার কর্তৃপক্ষ যা বলছে

কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করে ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের প্রধান হিসাবরক্ষক আবুল হাসান বলেন, ‘কৃষকদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। আমাদের ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৬০ হাজার বস্তা। ইতিমধ্যে ১ লাখ ৭১ হাজার বস্তা সংরক্ষণ করেছি। জায়গার অভাবে কৃষকদের ফেরত দিতে বাধ্য হচ্ছি।’

কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাকিন বলেন, ‘চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন। আগামী আলু আবাদের জন্য বীজ সংরক্ষণ জরুরি। হিমাগারগুলোকে কৃষকদের আলু বীজ সংরক্ষণে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।’

দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আনিছুজ্জামান বলেন, ‘আলুর দাম কমে যাওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সংরক্ষণের দিকে ঝুঁকেছেন। এতে হিমাগারগুলোর ওপর চাপ বেড়েছে। আলু সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আমদানি নির্ভরতা কমবে। কৃষকরা লাভবান হবেন।’

পরিস্থিতি কী বলছে

ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজটি দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, ঘোড়াঘাট ও হাকিমপুর—এই পাঁচ উপজেলার একমাত্র হিমাগার। আলুচাষিরা বলছেন, বীজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না হলে আগামী বছর আলু চাষ ব্যাহত হবে। তাঁরা দ্রুত হিমাগারের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

  • হিমাগারের ধারণক্ষমতা: ১ লাখ ৬০ হাজার বস্তা (৬০ কেজি ওজনের)

  • বর্তমানে সংরক্ষিত: ১ লাখ ৭১ হাজার বস্তা (১১ হাজার বেশি)

  • ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা: ফুলবাড়ী, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, ঘোড়াঘাট, হাকিমপুর

  • চাষিদের ভোগান্তি: জায়গা না পেয়ে ফেরত যাওয়া, বাড়তি পরিবহন খরচ

প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন বলে জানিয়েছেন। তবে হিমাগারের সীমাবদ্ধতা ও চাষিদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার মধ্যে সমন্বয় ঘটানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।