bogra times cover image-1
ঢাকারবিবার , ১৬ আগস্ট ২০২৬

শেরপুর পৌরসভার বর্জ্য যাচ্ছে পৌর কার্যালয়ে, ধূপ জ্বালিয়েও কাটছে না দুর্গন্ধ

এনাম হকঃ-
আগস্ট ১৬, ২০২৬ ৭:১৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

এনাম হক, বগুড়ার শেরপুর থেকে।।

বগুড়ার শেরপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠার দেড় বছর পরও স্থায়ী বর্জ্য নিষ্কাশনস্থল গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে শহরের আবর্জনার একটি অংশ পড়ছে করতোয়া নদীর তীরে, আরেক অংশ পৌরসভা কার্যালয়ের পেছনে স্তূপীকৃত হচ্ছে। দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা খাবার সময় পর্যন্ত ধূপকাঠি জ্বালাতে বাধ্য হচ্ছেন।

বগুড়ার শেরপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রায় দেড়’শ বছর পূর্বে। খাতা-কলমে প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভা একটি বাণিজ্যিক শহর হিসেবেও পরিচিত কিন্তু এত ইতিহাস ও মর্যাদার পরেও পৌরসভার সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। দীর্ঘ সময়েও বর্জ্য ফেলার জন্য স্থায়ী কোনো জায়গা তৈরি করতে পারেনি পৌরসভা ও ইউনিয়নগুলো।ফলে শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা বর্জ্যের একটি অংশ গিয়ে পড়ছে করতোয়া নদীর তীরে। অন্যদিকে, পৌরসভা কার্যালয়ের পেছনে বর্জ্য ফেলার কারণে আশপাশের বাসিন্দাদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত শেরপুর পৌরসভার আয়তন ১০ দশমিক ৩৯৫ বর্গকিলোমিটার। নয়টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত পৌরসভার জনসংখ্যা ৬১ হাজার ১৪১।প্রতিদিন এখানে উৎপন্ন হয় ৩০ থেকে ৪০ টন কঠিন ও গৃহস্থালি বর্জ্য। এর মধ্যে রয়েছে বাসাবাড়ির আবর্জনা, বাজারের উচ্ছিষ্ট, শিল্পকারখানার বর্জ্য এবং হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্যসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য।

সম্প্রতি সরেজমিনে শেরপুর শহরের ঘাটপার, বারদুয়ারী হাট, ফুলবাড়ী ব্রিজসহ করতোয়া নদীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদীর পাড় ও আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। কোথাও বর্জ্য স্তূপ করে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও নদীর পানির কাছাকাছি ফেলা হয়েছে এসব আবর্জনা।

পৌরসভার বাইরের এলাকাতেও একই চিত্র। শাহ বন্দেগী ইউনিয়নের হামছায়াপুর, শেরুয়া বটতলা ও খোন্দকারটোলা এবং কুসুম্বী ইউনিয়নের দুবলাগাড়ী এলাকায় বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এসব এলাকায় নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠলেও বর্জ্য ফেলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থান নেই। ফলে গৃহস্থালিসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যের বড় একটি অংশ করতোয়া নদীতে গিয়ে পড়ছে。

পৌরসভা সূত্র বলছে, শেরুয়া বটতলা এলাকায় বর্জ্য ফেলার জন্য পৌরসভার নিজস্ব প্রায় ২ দশমিক ৫ একর জায়গা রয়েছে। তবে জায়গাটির চারপাশে আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠায় সেখানে বর্জ্য ফেলা বন্ধ রাখতে হয়েছে। ফলে নিজস্ব জমি থাকা সত্ত্বেও সেটি এখন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগাতে পারছে না পৌরসভা।

বর্তমানে পৌরসভা কার্যালয়ের পেছনের একটি জায়গায় বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এতে পৌরসভা কার্যালয় ও আশপাশের বসতবাড়িতে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে。।

পৌরসভার পেছনে বর্জ্য ফেলার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আশপাশের বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দা মনরঞ্জন বলেন, ‘যখনই খেতে বসি, ধূপকাঠি জ্বালিয়ে খেতে হয়। গন্ধে ভাত খাওয়া যায় না। জনবহুল জায়গা থেকে ময়লার ভাগাড় সরিয়ে অন্য জায়গায় নেওয়া দরকার。’।

আরেক বাসিন্দা বিকাশ বলেন, ‘ময়লা ফেলার সময় আশপাশে অস্বস্তিকর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার。’।

পৌরসভায় কথা বলে জানা যায়, বর্জ্য অপসারণের কাজে জনবলের ঘাটতি নেই। শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে চারজন চালক ও ৩৫ জন শ্রমিক প্রতিদিন কাজ করছেন। তবে বর্জ্য ফেলার স্থায়ী জায়গা না থাকায় নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ করেও সংকটের সমাধান হচ্ছে না।

পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শেরুয়া বটতলার জায়গাটি বর্তমানে আবাসিক এলাকার মধ্যে পড়ে গেছে। সেখানে বর্জ্য ফেলা সম্ভব হচ্ছে না। নির্দিষ্ট জায়গার অভাবে পৌরসভার পেছনে বর্জ্য ফেলতে হচ্ছে। এতে আশপাশের এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে。।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট কাটাতে নতুন জায়গা খুঁজছে পৌরসভা। নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, শেরুয়া বটতলার ২ দশমিক ৫ একর জায়গাটি বিক্রির জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি হোসনাবাদ মৌজায় প্রায় সাত একর জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে。

তাঁর ভাষ্য, ‘হোসনাবাদের ওই জায়গা সরকারিভাবে কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য প্রশাসনিক অবমুক্তির অনুমতি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে。’

পৌরসভার সাবেক মেয়র জানে আলম খোকা বলেন, ‘পৌরসভার বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। বটতলায় পৌরসভার নিজস্ব জায়গা থাকলেও সেখানে আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠায় ময়লা ফেলা সম্ভব হচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার মেয়াদকালে শহরের পাশে ভস্তার বিল এলাকায় বর্জ্য ফেলার জন্য জায়গা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পাওয়া গেলে জায়গা কিনে স্থায়ীভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করা সম্ভব হতো。’

শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, ‘স্থায়ী বর্জ্য নিষ্কাশনস্থলের জন্য আগের মেয়রের সময় মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। তবে পৌরসভার আর্থিক সক্ষমতা, বেতন-ভাতা পরিশোধসহ কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে মন্ত্রণালয় তখন প্রস্তাবটি নাকচ করে দেয়。।

শেরপুর পৌরসভার বর্জ্য যাচ্ছে পৌর কার্যালয়ে, ধূপ জ্বালিয়েও কাটছে না দুর্গন্ধ

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে নতুন করে প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা চলছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যও এ বিষয়ে সহযোগিতা করছেন। অনুমোদন পাওয়া গেলে স্থায়ী বর্জ্য নিষ্কাশনস্থল তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।

পৌরসভার প্রতিদিনের বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের ব্যবস্থা থাকলেও স্থায়ী নিষ্পত্তিস্থল না থাকায় দীর্ঘদিনের এই সংকট কাটছে না। ফলে শহরের বর্জ্যের একটি অংশ গিয়ে পড়ছে করতোয়া নদীর তীরে।【0†L39】 এতে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে নদীর পরিবেশ। করতোয়া নদীর পানি ও পরিবেশ দূষিত হওয়ার পাশাপাশি নদী ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রতিদিনের বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের ব্যবস্থা থাকলেও স্থায়ী নিষ্পত্তিস্থল না থাকায় দেড়’শ বছর পুরোনো এই পৌরসভার বাসিন্দাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। করতোয়া নদীর তীরে ও পৌরসভা কার্যালয়ের পেছনে জমা হচ্ছে বিষাক্ত আবর্জনা। দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে খাবার খেতে হচ্ছে মানুষকে। পৌরসভার নতুন উদ্যোগ সফল হয় কিনা, সেদিকেই এখন তাকিয়ে শেরপুরবাসী।